সিএসআরএল-এর দেশব্যাপী কৃষি পদযাত্রায় নানা শ্রেণীপেশার মানুষের সংহতি: মঙ্গলবার সমাপনী সমাবেশ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে
চ.নো.রিপোর্ট-
‘স্বাধীনতার ৪০ বছর পূর্তির আহবান : খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য চাই 11সামগ্রিক কৃষি সংস্কার কর্মসূচি’ এই শ্লোগানে রোববার থেকে দেশের প্রতিটি প্রান্ত থেকে ‘গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযান (সিএসআরএল)-এর উদ্যোগে শুরু হয়েছে কৃষি পদযাত্রা ২০১১। খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের অধিকার নিশ্চিত করা এবং দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণের দাবিতে সারা দেশ থেকে ২ হাজার তরুণ-তরুণীর এই পদযাত্রায় সংহতি জানিয়েছেন সারাদেশের নানা শ্রেণী পেশার মানুষ। মঙ্গলবার ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশের মাধ্যমে সমাপ্ত হবে এই পদযাত্রা।
সামগ্রিক কৃষি সংস্কার কর্মসূচির পক্ষে জনমত গঠনের জন্য সোমবরা খুলনা, সাতক্ষীরা, যশোর, নড়াইল, মাগুরা, ফরিদপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, রাজবাড়ি, রংপুর, সুনামগঞ্জ, সিলেট, টেকনাফ ও কক্সবাজার অতিক্রম করেছে। আগামীকাল (২৯ মার্চ ২০১১, মঙ্গলবার) চট্টগ্রাম, দিনাজপুর, গাইবান্ধা, সিরাজগঞ্জ, শ্রীমঙ্গল, কিশোরগঞ্জ, ফেনী, নোয়াখালী, কুমিলøা, গাজীপুর ও মানিকগঞ্জে তরুণরা পথসভা, গণজমায়েত, মানববন্ধন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, অবস্থানসহ নানা কর্মসূচি পালন করে। এসকল জেলায় পদযাত্রায় অংশগ্রহণকারীরা গণসংযোগ শেষে মঙ্গলবার দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাপনী সমাবেশে যোগ দিবে। সমাপনী সমাবেশে সংসদ সদস্য,  বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য, কৃষক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি এবং তরুণ-তরুণীসহ ৪ সহস্রাধিক মানুষ অংশ নিবেন।
বাংলাদেশের ৬৩ শতাংশ মানুষ এখনও গ্রামে বাস করে আর এই গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর জীবন ও জীবিকা সরাসরি কৃষির উপর নির্ভরশীল। দেশের মোট ক্ষেত্রে কৃষির একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। জিডিপিতেও কৃষির ভূমিকা ২০ শতাংশ। শিল্পখাত, বাণিজ্য ও সেবাখাতে কৃষির ভ‚মিকা যোগ করলে এ হার আরও বাড়বে। আমাদের ১৬ কোটি মানুষের খাদ্যের জোগান দেয় ১ কোটি ৮০ লাখ কৃষক যাদের প্রতি ৫ জনের ৪ জনই ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষি। দেশের সার্বিক উন্নতি হলেও তার সুবিধা পায় সামান্যই। ধীরে ধীরে তারা কৃষিতে বিনিয়োগে অÿম হয়ে পড়ছে। ইতিমধ্যে সরকার কৃষকদের ঋণ দেয়ার বিভিন্ন উদ্যোগ নিলেও মাত্র ২৭ শতাংশ কৃষক এসব ঋণ পায়।
দেশে কৃষির সাথে সংশিøষ্ট ২৬টি নীতি, আইন ও কৌশলপত্র আছে। এগুলোর একটার সঙ্গে আরেকটা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এছাড়া এসব নীতি বা¯Íবায়নকারী মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যেও আছে সমন্বয়হীনতা। ফলে সামগ্রিকভাবে কৃষির সুফল ভোগ করতে পারছে না বাংলাদেশ। মৎস্য, গবাদিপশু, হাঁসমুরগি, বন, জলাভ‚মি সামগ্রিকভাবে কৃষির উপখাত হলেও এসব ভিন্ন ভিন্ন নীতি আছে। ফলে কৃষিনীতি পরিণত হয়েছে ‘ফসলনীতি’তে। আবার, সামগ্রিক কৃষির তুলনায় এর উপখাতগুলোর উপর গুরুত্ব দেয়ার কারণে খাদ্য নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়ছে।
কৃষিখাতের বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্তে¡ও সার্বিক খাদ্যচাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে এখনও বিস্তর ফারাক বিদ্যমান। তাই, প্রতিবছরই ২৫-৩৫ লাখ টন খাদ্য আমদানি করে আমাদের চাহিদা মেটাতে হয়। কৃষির প্রধান সমস্যাগুলো হলো : (১) কৃষকদের পক্ষে দর-কষাকষির কোনো শক্তিশালী সংগঠন নেই; (২) কৃষি উপকরণ দুষ্প্রাপ্য ও দুর্মূল্য; (৩) কৃষিতে প্রয়োজনীয় অর্থায়নের অভাব; (৪) অপ্রতুল কৃষিসেবা; (৫) খাসজমি, জলাশয়, খাল-বিল-নদী-বনভূমিতে কৃষকদের প্রবেশাধিকার নেই; (৬) উৎপাদিত কৃষিপণ্যের লাভজনক মূল্য নেই; (৭) জলবায়ু পরিবর্তনসহ মানবসৃষ্ট কারণে কৃষি প্রতিবেশ ও প্রাণবৈচিত্র্য বিপন্ন; (৮) কৃষিতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির ব্যবহার সীমিত; (৯) কৃষিতে নারীর অংশগ্রহণ ও অধিকার নিশ্চিত হয় নি এবং (১০) কৃষি সংশ্লিষ্ট নীতিগুলোর মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতা ও বাস্তবায়নে সমন্বয়হীনতা।
এই সমস্যাগুলো সামনে নিয়ে দেশের ৩০টি কৃষি-প্রতিবেশ অঞ্চলে কর্মরত ২ শতাধিক স্থানীয়, জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের জোট ‘গ্রামীণ জীবনযাত্রার স্থায়িত্বশীল উন্নয়নের জন্য প্রচারাভিযান (CSRL)’-এর উদ্যোগে প্রায় ৪ হাজার ব্যক্তি-দিবস কাজ করে ‘সামগ্রিক কৃষি সংস্কার কর্মসূচি (CARP)’-এর খসড়া প্রণয়ন করা হয়। ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক, কৃষিবিদ, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন সংগঠনসহ সমাজের নানা শ্রেণীপেশার ব্যক্তিবর্গ কার্প (CARP)’ প্রণয়নের বিভিন্ন পর্যায়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন। এরপর ২০০৮ সালের ৩ নভেম্বর ‘জাতীয় কৃষি কনভেনশনে’ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, নাগরিক সমাজ প্রতিনিধি, ÿুদ্র ও প্রান্তিক চাষি, গবেষক, কৃষিবিদ এবং জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কার্প প্রকাশ করা হয়। কার্পের অধিকাংশ বিষয়ে সরকারি ও বিরোধীদলের নেতৃবৃন্দ সমর্থন জানান এবং বাস্তবায়নের প্রতিশ্রুতি দেন।
বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কৃষিখাতের উপর গুরুত্বারোপ করেছে এবং গত ২ বছরে কয়েকটি সফল ও ইতিবাচক উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। কিন্তু এই উদ্যোগগুলোর পেছনে যে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার তার অনুপস্থিতি লক্ষণীয়। দীর্ঘমেয়াদে খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হলে সামগ্রিক কৃষি সংস্কার কর্মসূচিটি সরকারের ‘রূপকল্প ২০২১’-এর অন্তর্ভূক্ত করা প্রয়োজন। ইতিমধ্যে সরকার আর কোনো দারিদ্র্য বিমোচন কৌশলপত্র (পিআরএসপি) প্রণয়ন করবে না। এ উদ্দেশ্যে রূপকল্প ২০২১-এর অধীনে পার্সপেকটিভ প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। এছাড়া ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাও চ‚ড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার আওতায়ই তৈরি করা হয় জাতীয় বাজেট। কৃষি, তথা খাদ্য নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনের জন্য জাতীয় পরিকল্পনায় সামগ্রিক কৃষি সংস্কার কর্মসূচি অন্তর্ভূক্ত করার কোনো বিকল্প নেই।
এ উদ্দেশ্যে সামগ্রিক কৃষি সংস্কার কর্মসূচি সম্পর্কে জনমত তৈরি, নীতি নির্ধারণী নেতৃবৃন্দের ইতিবাচক মনোভাব সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের সমর্থন পাওয়ার উদ্দেশ্যে সারা দেশ থেকে তরুণদের কৃষি পদযাত্রার আয়োজন করা হয়েছে। গত ২৭ মার্চ রোববার সকালে সুনামগঞ্জ, সাতক্ষীরা, টেকনাফ ও পঞ্চগড় থেকে পদযাত্রাটি শুরু হয় এবং ৩০টি জেলাশহরে গণজমায়েত শেষে আগামীকাল দুপুরে ঢাকায় পৌছাবে।
কৃষি পদযাত্রা ২০১১