চৌমুহনী সাধারণ ব্যবসায়ী সমতির নির্বাচনে মরিয়া মজুদদার সিন্ডিকেট, নেপথ্যে জামাত ও তাঁদের অনুসরারী দুটি ব্যাংকের কর্মকর্তারা
11
রুদ্র মাসুদ-
বৃহত্তর নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্যকেন্দ্র চৌমুহনী এখন ব্যাংকের নগরীও । বুধবার অনুষ্ঠিতব্য ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচনকে ঘিরে এখন চৌমুহনী পরিণত হয়েছে পোস্টারের শহরে। নির্বাচনে ২১টি পদের বিপরীতে লড়ছেন ৬৭জন প্রার্থী। ১ হাজার ৯৮৪জন  ব্যবসায়ী এদিন সকাল ৮টা থেকে বিকাল ৪টা পর্যন্ত তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করবেন।
এদিকে নির্বাচনকে ঘিরে বিগত দেড় যুগের মতো এবারো সমিতির নেতৃত্বকে কব্জায় নিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে মজুতদার, পাচারকারী, চোরাকারবারী ও ভূমিদস্যু সিন্ডিকেট। আর এই সিন্ডিকেটকে নেপথ্য থেকে সক্রিয় সহযোগীতা করছে জামায়াত এবং তাঁদের অনুসারি চৌমুহনীর ফেনী রোডের দুটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপকসহ কর্মকর্তারা। সঙ্গে রয়েছে জেএসডি, আওয়ামীলীগ ও বিএনপি সমর্থিত এক ডজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী। এ অবস্থায় সিন্ডিকেট সমর্থিত একজন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী নির্বাচিত হলে ব্যবসায়ীদের কল্যাণে ভ‚মিকা রাখার চেয়ে ব্যবসায়ীদের শালিশ নিয়ে দীর্ঘ পরিকল্পনার কথা লিফলেট আকারে প্রচার করার পর ব্যবসায়ীদের মাঝে নতুন করে আতংক দেখা দিয়েছে।
সরেজমিনে চৌমুহনীর বিভিন্ন সড়ক ঘুরে দেখা গেছে পোষ্টারে ছেয়ে গেছে গোটা চৌমুহনী। দোকানে দোকানে ছুটছেন প্রার্থীরা। প্রচারপত্র, ছোট পোষ্টার ও ষ্টিকার হাতে নিজের পক্ষে ভোট চাইছেন প্রার্থীরা। নির্বাচন নিয়ে গোটা চৌমুহনীতে এখন উৎসবের আমেজ। তবে এবারের নির্বাচনে ৬৭জন প্রার্থীর মধ্যে তরুণ প্রার্থীর সংখ্যাই বেশি বলে জানান ব্যবসায়ীরা।
চৌমুহনীর ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, বৃহত্তর নোয়াখালীসহ আশপাশের জেলাগুলোর মধ্যে প্রধান এই বাণিজ্য কেন্দ্রে প্রায় ৪ হাজার ব্যবসা প্রতিষ্ঠান রয়েছে। তন্মধ্যে ভোটার হয়েছে অর্ধেক ভোটার। এখানকার ৪৪টি ব্যাংক ও ৪টি ব্রোকারেজ হাউজ মিলিয়ে প্রতিদিন গড়ে লেনদেন হয় প্রায় দেড়শ কোটি টাকা। জেলায় সরকারি রাজস্ব আয়ের অর্ধেক যায় এই চৌমুহনীর ব্যবসায়ীদের পকেট থেকে। কিন্তু বিগত দেড়যুগ ধরে যারা চৌমুহনী ব্যবসায়ী সমিতির নেতৃত্বকে কব্জা করে রেখেছেন তারা দীর্ঘদিনের পূঞ্জিভ‚ত সমস্য ব্যবসায়ী-শ্রমিক বিরোধ নিষ্পত্তি, মালামাল লোড-আনলোডের জন্য নির্ধারিত ট্রাক ষ্ট্যান্ড প্রতিষ্ঠা এমনকি যানজট নিরসনে কার্যকর কোন ব্যবস্থা গ্রহণ না করার কারণে অর্ধেকেরও বেশি ব্যবসায়ী সমিতির ভোটার হয়নি।
তারওপর ভোগ্যপন্যের ব্যবসা করেন এমন ১৫/১৬ জন ব্যবসায়ীর নেতৃত্বে গড়ে ওঠা সিন্ডিকেট গোটা সমিতিকে জিম্মি করে রেখেছে। এই সিন্ডিকেটকে নেপথ্য থেকে পূর্ণ সমর্থন দিয়ে আসছে মৌলবাদী রাজনৈতিক দল জামায়াতে ইসলামী। সিন্ডিকেটে জেএসডি, আওয়ামীলীগ ও বিএনপি সমর্থিত ব্যবসায়ীরা থাকলেও তাদের নিয়ন্ত্রন এই মৌলবাদী সংগঠন ও তাঁদের নিয়ন্ত্রনাধীন দুটি ইসলামী ব্যাংকের কর্মকর্তাদের হাতে। একজন ব্যাংক ব্যবস্থাপককে সরাসরি সমিতির কর্মকান্ডে না গলাতে দেখা যায়। এ সিন্ডিকেট চৌমুহনীতে হিন্দুদের সম্পত্তি এবং সরকারি সম্পত্তি গ্রাস করে চলেছে বছরের পর বছর। ভ‚মি নিয়ে বিরোধ মিমাংসার নামে গত দেড় দশক ধরে এই সিন্ডিকেট হাতিয়ে নিয়েছে কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি। ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে ষ্ট্যাম্পে স্বাক্ষর নিয়ে বছরের পর বছর ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত নিজেরাই সুবিধা লুটে নেয় সিন্ডিকেটের সদস্যরা। এই ধারাবাহিকতায় সিন্ডিকেট সমর্থিত একজন সাধারণ সম্পাদক প্রার্থী শালিস নিয়ে দীর্ঘ পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন নিজের প্রচারপত্রে। শেষ মুহুর্তে এসে মরিয়া হয়ে উঠেছে এই সিন্ডিকেট।
তরুণ ব্যবসায়ী সাহাব উদ্দিনের মতে সিন্ডিকেট সদস্যরা বাজারের হাজার হাজার ব্যবসায়ীকে ব্যবসায়ী হিসাবে স্বীকার করতেও নারাজ। কিন্তু অর্থ আর রাজনৈতিক নেতাদের হাত করে এরা ব্যবসায়ীদের নেতৃত্বকে কৌশলে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায়। তবে; এবার পরিস্থিতি ভিন্ন। তারপরও শালিশ নিয়ে যে পরিকল্পনার কথা প্রচার করা হচ্ছে তা ব্যবসায়ীদের জন্য কখনোই সুখকর নয়।
নির্বাচন কমিশন সুত্রে জানা যায়, সমিতির নির্বাচনে সভাপতি পদে ২জন, তিনজন সহ-সভাপতির পদের বিপরীতে ১১জন, সাধারণ সম্পাদক পদের বিপরীতে ৩জন, সহ-সাধারণ সম্পাদকপদে ২জন, কোষাধ্যক্ষ পদে ৪জন, সাংগঠনিক সম্পাদক পদে ৩জন, দপ্তর সম্পাদক পদে ২জন, শ্রম বিষয়ক সম্পাদক পদে ৩জন, প্রচার সম্পাদক পদে ৪জন, ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক পদে ৪ জন, ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক (মুসলিম) পদে ২জন, ধর্ম বিষয় সম্পাদক (হিন্দু) পদে ২ জন এবং ৭জন সদস্য পদের বিপরীতে ২৫জন প্রার্থী হয়েছেন।
চৌমুহনী সাধারণ ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচন পরিচালনা পরিষদের প্রধান সমন্বয়কারী অধ্যক্ষ আবুল কালাম আজাদ জানান, আগে বাইরে থেকে সিন্ডিকেটের কথা শোনা যেতো এবারের নির্বাচনে এধরণের কোন সিন্ডিকেটের খবর তাঁর জানা নেই। নির্বাচনে একজন প্রিসাইডিং অফিসার ও ৩১জন সহকারি প্রিসাইডিং অফিসার দায়িত্ব পালন করবে। ২০টি বুথে ব্যবসায়ীরা ভোট দিবেন। নিরাপত্তার জন্য ৪জন এসআই এবং ৩০জন কনষ্টেবল চাওয়া হয়েছে। এছাড়া একজন নির্বাহী ম্যাজিষ্ট্রেট সার্বক্ষণিক থাকবেন ভোটগ্রহণ থেকে গণনা পর্যন্ত। এছাড়া বেগমগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও বেগমগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও নির্বাচন পর্যবেক্ষণে থাকবেন। তিনি শান্তিপূর্ণ নির্বাচনে সকলের সহযোগীতা কামনা করেন।
কৃষি ও অর্থনীতি