স্কুল পালানো কিশোরের রণাঙ্গনের চিঠি, অতপর শহীদ
পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন স্কুল ছাত্র আমান উল্যা ফারুক। যুদ্ধে অংশ নেওয়ার কারণ জানিয়ে রণাঙ্গন থেকেই বাবাকে লেখেন চিঠি। তিনি আর রণাঙ্গণ থেকে ফিরেননি। শহীদ হয়েছেন বামনীর যুদ্ধে। সেই কিশোরকে নিয়ে লিখেছেন মুক্তিযোদ্ধা আবুল হোসেন বাঙালী...
শহীদ আমান উল্যা ফারুক বেগমগঞ্জের অম্বরনগর গ্রামের এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্ম গ্রহণ করেন। তার পিতার নাম আব্দুল হালিম চৌধুরী। মাতা সৈয়দা হোসনেয়ারা চৌধুরী। তিন ভাই চার বোনের মধ্যে তিনি দ্বিতীয় বড় এক বোন বাকীরা সবাই ছোট। ছোট থেকেই আমান উল্যাহ ফারুক ছিলেন ডানপিঠে পাশাপাশি মেধবীও। বাবা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান রেলওয়ের অডিট বিভাগে চাকুরী করতেন। সে কারণে প্রথম জীবনে চট্রগ্রাম কলিজিয়েট স্কুলে লেখাপড়া শুরু করেন। নবম শ্রেণী পর্যন্ত সেখানে ছিলেন। তখনকার দেশের উত্তাল রাজনৈতিক পরিস্থিতি কিশোর ফারুকের মনকে নাড়া দিতো। সে বয়সেই তিনি জড়িয়ে পড়েন রাজনীতিতে। বাবা যখন বুঝতে পারেন ছেলে (ফারুক)  রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে উঠেছে তখন তাকে চট্রগ্রাম থেকে নোয়াখালীতে নিয়ে এসে এলাকার আলাইয়ার পুর কাজির হাট পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। যে রাজনৈতিক দীক্ষা তিনি নিয়েছেন তার চর্চা তিনি এলাকায় শুরু করেন। এলাকায় তিনি হয়ে ওঠেন ছাত্রলীগের একজন সক্রিয় কর্মী;একজন দক্ষ সংগঠক।
২৫শে মার্চে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর ঘুমন্ত বাঙালীদের উপর নারকীয় হত্যাযজ্ঞ। আর বঙ্গবন্ধুর ডাকে শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ তখনি আমান উল্যা ফারুকের মধ্যে দেশকে শত্রুমুক্ত করার নেশা জাগে। ফারুক ভারতে গিয়ে ট্রেনিং শেষ করে ফিরে আসে। তার অদম্য সাহসিকতা এবং দৃঢ় মনোবলের কারণে তাকে রাখা হয় বিএলএফ এর জেলা টিমে। জেলা টিমে সদস্য হিসাবে ২ সেপ্টেম্বর রাতে শহীদ সালেহ আহম্মদ মজুমদারের সাথে ছুটে যায় কোম্পানীগঞ্জে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াই করতে। ৪ সেপ্টেম্বর কোম্পানীগঞ্জের রামপুর ইউনিয়নের বাঞ্চারাম বামনী বেড়ীর উপর পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী ও তাদের এ দেশীয় দোসর রাজাকার বাহিনীর সাথে সন্মুখ যুদ্ধে ছালেহ আহম্মদ মজুমদারসহ যে ৬জন শহীদ হয়েছিলেন তাদের মধ্যে আমনউল্যাহ ফারুকও একজন। তারমধ্যে দুর্ভাগ্য শহীদ আমান উল্যাহ ফারুকের লাশ গুলিবিদ্ধ হবার পর খালে পড়াতে স্রোতের টানে ভেসে যায়। সহযোদ্ধারা অনেক খোজাখুজি করেও তার লাশ পায়নি। জনশ্রুতি আছে দুইদিন পর চর আলগিতে জেলেরা ভাসমান অবস্থায় তার লাশ পায় এবং এখানে তাকে কবর দেয়। আমি ব্যক্তিগতভাবে চর আলগীতে অনেক সন্ধান করেও কবরটির চিহ্নও পাইনি।
স্বাধীণতার পর এ বীর শহীদের স্মৃতিকে চির অম্লান করে রাখতে তার এলাকাবাসী কাজীর হাট পাবলিক হাই স্কুলের নামকরণ করে শহীদ আমান উল্যাহ ফারুক পাবলিক উচ্চ বিদ্যালয়।
বাংলাদেশ স্বাধীন হবার পর ১৯৭২ সালে দৈনিক আজাদ পত্রিকার নিজস্ব নিবন্ধকার শহীদ আমান উল্যা ফারুকের উপর একটি নিবন্ধ লিখেন। এবং যুদ্ধে যাবার সময় শহীদ আমন উল্যা ফারুক তার বাবাকে একটি পত্র লেখেন। সেই পত্রটি নিবন্ধকার নিয়ে যান যা তিনি আর ফেরৎ দেননি। তাই অনেকটা বাধ্য হয়েই আমার এ লেখার সাথে আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধটি হুবহু তুলে দিলাম। তার লেখা পত্রটি পড়লেই বুঝাযাবে এত অল্প বয়সে ফারুক কতটুকু দেশ প্রেমিক এবং রাজনীতি সচেতন ছিলো। ফারুকের লেখা আরেকটি পত্র তার বাবার কাছে রক্ষিত থাকার কারণে তা আমার সংগ্রহে রয়েছে। সে পত্রটি তার বড় বোনকে লেখা। এ প্রবন্ধে তার লেখা সেই পত্রটিও তুলে ধরলাম এ প্রজন্মের কাছে যাতে তারা শহীদ ফারুকের মেধা ও প্রজ্ঞাকে জানতে পারে।
দৈনিক আজাদ পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ
২২ শে মাঘ
১৩৭৮ বাংলা
নিজস্ব নিবন্ধকার
মা-বাবা জন্মদেয়। মাটি লালন করে। কিন্তু আমরা জননী মাতৃভূমি আর দেশের মাটিকে কতটুকু ভালবাসি? দেশকে ভালোবাসার অধিকার প্রতিটি দেশবাসীরই রয়েছে। কেউ স্বাক্ষর রেখে যান কেউ তা পারে না। বাংলাদেশের স্বাধীণতা সংগ্রামে যেসব বীর তরুণ মুক্তিসেনা দেশ মাতৃকার জন্য সে স্বাক্ষর রেখে যান তাদের মধ্যে নোয়াখালী তথায় বেগমগঞ্জের শহীদ আমান উল্যা ফারুক একটি উজ্জল নাম। ফারুকের বয়স খুব বেশী নয়। মাত্র ষোল বছর। সে ছিলো প্রবেশিকা পরীক্ষার্থী।
মাতৃভূমি যখন পাকি দস্যু বাহিনী পাগলা কুকুরের মতো বর্বরোচিত হামলা চালাচ্ছিলো তখন ফারুকের মনে তারুণ্যর বিদ্রোহ জেগে উঠেছিলো প্রবল ভাবে। সে ভাবছিলো তার সে সংগ্রাম মধুর দিনগুলিতে কি করা উচিৎ। ঘরে বসে সময় হত্যা করা নাকি কাপুরুষের মতো পালিয়ে গিয়ে নিরাপদ দুরত্বে আশ্রয় গ্রহণ করা।
ফারুক ঘরে বসে বসে সময় হত্যা করেনি। ফারুক আরাম আয়েসে থাকার কথা চিন্তাও করেনি। ফারুক যায়নি পালিয়ে। পালিয়ে গিয়ে করেনি কাপুরুষের মতো আত্মরক্ষা । ফারুক অমিত বিক্রমে আপন কাঁধে তুলে নিয়েছিলো হাতিয়ার। ফারুক ভেবেছিলো শত্রু সৈন্যের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে ধরে হয় সে বীরের মতো শহীদ হবে নয়তো সে বীরের সন্মান এর মুকুট মাথায় নিয়ে গাজী হয়ে ফিরে আসবে তার বাবা মায়ের স্নেহের কোলে। ফারুক গাজী হয়ে আর ফিরে আসেনি। যুদ্ধ করায় ফারুক শহীদ হয়েছে। গত ৪ সেপ্টেম্বর পাক হানাদার ও কুখ্যাত রাজাকার বাহিনীর সাথে এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামে ফারুক কোম্পানীগঞ্জ থানাধীন রামপুরে শহীদ হয়। শহীদ ফারুকের স্মৃতির প্রতি সন্মান প্রদানের উদ্দেশ্যে কাজীর হাট হাই স্কুলকে আমান উল্যা হাই স্কুল নাম করা হয়েছে। ফারুকের পুরা নাম আমান উল্যা চৌধুরী।
ফারুক নেই। তার স্মৃতি আছে। আর আছে মুজিব বাহিনীতে যোগদানের প্রাক্কালে তার বাবা মৌঃ হালিম উল্যা চৌধুরীর কাছে লেখা একটি চিঠি। হালিম উল্যা চৌধুরী নোয়াখালী’র বেগমগঞ্জ থানার অন্তর্গত অম্বর নগরের বাসিন্দা। ফারুকের বুকে আশাছিলো। চোখ ভরা ছিলো স্বপ্ন। কিন্তু সে আশা আর স্বপ্ন্ আজ বিলীন হয়ে গেছে। সবকিছু মিলিয়ে গেছে অনন্ত শূণ্যতায়। বাংলাদেশে যখন খানসেনাদের অত্যাচার চরমে উঠেছে ফারুকের তরুণ মনে তখনই প্রশ্ন জেগেছে যে পাক বাহিনী ওর সম¯Í স্বপ্ন্ চুরি করতে এগিয়ে আসছে। কাজে আর দেরী নয়। যুদ্ধে যাওয়ার আগে সে তার বাবাকে লিখেছিলো একটি চিঠি। বুকের রক্ত দিয়ে যেই চিঠিতে সে লিখেছিলো “বাংলাদেশ”।
অথচ আশ্চর্য এই যে বাংলাদেশে তখনো ছিলো পাকবাহিনীর করাল গ্রাসের হিংস্র ছোবল। ফারুক তবুও চিঠির মাথায় “বাংলাদেশ” লিখে এক অতি নির্মম বাস্তব দুরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছে। ফারুকের চিঠির প্রতিটি ছত্রে ছত্রে ফুটে উঠেছে দেশের প্রতি সুগভীর ভালবাসার প্রজ্জলিত প্রতিচ্ছবি। আমরা এখনো বাবার কাছে লেখা শহীদ ফারুকের চিঠি ছেপেদিলাম।

বাবাকে লেখা শহীদ ফারুকের চিঠি
ফারুক

জয়তু-বাংলাদেশ
২৩/৫/৭১ইং

জনাব বাবাজান,
আজ আমি পালাইয়া যাচ্ছি। জানিনা কোথায় যাচ্ছি। শুধু এই টুকু জানি বাংলাদেশের একজন তেজদীপ্ত বীর স্বাধীণতাকামী সন্তান হিসাবে যেখানে যাওয়া দরকার সেখানেই যাচ্ছি। বাংলার বুকে বর্গী নেমেছে। বাংলার নিরীহ জনতার উপর নরপিচাশ রক্ত পিপাসু পাক সৈন্যরা যে অকথ্য বর্বর অত্যাচার আর পৈশাচিক হত্য লীলা চালাচ্ছে তা জানা স্বত্বেও আমি বিগত ১ মাস পঁচিশ দিন যাবত ঘরের মধ্যে বিলাস বাসনে মত্ত থেকে যে ক্ষমাহীন অপরাধ করেছি আজ সে অপরাধের প্রায়শ্চিত্ত করার জন্য যাত্রা শুরু করলাম। সমগ্র বাঙালীরা যে আমায় ক্ষমা করতে পারে। আপনি হয়তো দুঃখ পাবেন। দুঃখ পাওয়ার কথা, যে সন্তানকেক সুদীর্ঘ ষোল বছর ধরে তিলতিল করে হাতে কলমে মানুষ করেছেন, যে ছেলে আপনার বুকে বার বার শানিত কৃষাণের আঘাত করেছে। যে ছেলে আপনাকে কখনো এতটুকু শান্তি দিতে পারেনি। অথচ আপনি আপনার অবাধ্য দামাল ছেলেকে বার বার ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখেছেন। যার সমস্ত অপরাধ আপনি সীমাহীন মহানুভবতার সঙ্গে ক্ষমা করেছেন। আপনি আমাকে ক্ষমা করেছেন সম্ভবতঃ একটি মাত্র কারণে যে আপনার বুকে পুত্রু বাৎসলের রয়েছে প্রবল আকর্ষণ।
আজ যদি আপনার সেই জ্যেষ্ট পত্র ফারুক স্বেচ্ছায় যুদ্ধের ময়দানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ন্যায়ের পক্ষে যুদ্ধে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে তাহলে আপনি কি দুঃখ পাবেন বাবা ?
আপনার দুঃখিত হওয়া সাজে না। কারণ হানাদারদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে যদি নিহত হই আপনি হবেন শহীদের পিতা।
আর যদি গাজী হিসাবে আবার ফিরে আপনার স্নেহ ছায়াতলে ফিরে আসতে পারি তাহলে আপনি হবেন গাজীর পিতা। গাজী হলে আপনার গর্বের ধন হবো আমি। শহীদ হলেও আপনার অগৌরবের কিছু হবো না। আপনি হবেন বীর শহীদের বীর জনক। কোনটার চেয়ে কোনটা কম নয়। ছেলে হিসেবে আমার আবদার রয়েছে আপনার উপর। আজ সেই আবদারের উপর ভিত্তি করেই আমি জানিয়ে যাচ্ছি, বাবা আমিতো প্রবেশিকা পরীক্ষার্থী। আমার মনে কত আশা কত স্বপ্ন। আমি প্রবেশীকা পরীক্ষায় পাশ করে কলেজে যাবো। আবার কলেজ ডিঙ্গিয়ে যাবো বিশ্ববিদ্যালয় অঙ্গনে। মানুষের মত মানুষ হবো আমি।
আশা শুধু আমি করিনি আপনিও করেছিলেন। স্বপ্ন আপনিও দেখেছিলেন।
কিন্তু সব আশা সব স্বপ্ন আজ এক ফুৎকারে নিভে গেলো। বলতে পারেন এর জন্যে দায়ী কে ? দায়ী যারা যেসব নর ঘাতকের কথা আপনিও জানেন। আমিও জানি। বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষ ওদের কথা জানে। ইংরেজীতে একটা কথা আছে  “ স্বর্গের চেয়েও উত্তম মা এবং মাতৃভূমি”। আমি তো যাচ্ছি আমার স্বর্গরূপী গরিয়সী মহিয়সী সেই মাতৃভূমিকে শত্রুর কবল থেকে উদ্ধার করতে। আমি যাচ্ছি শত্রুকে নির্মূল করে আমার দেশের মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে। বাবা শেষ বারের মতো আপনাকে একটা অনুরোধ করবো। সর্ব শক্তিমান আলাহ্র নিকট সবসময় দোয়া করবেন আমি যেন গাজী হয়ে ফিরতে পারি। আপনি বদদোয়া বা অভিশাপ দেন তাহলে আমার ভবিষ্যত অন্ধকার।
জীবনে বহু অপরাধ করেছি। কিন্তু আপনি আমায় ক্ষমা করেছেন। এবারও আপনি আমায় ক্ষমা করবেন এই আশাই আমি করি। আপনি আমার শতকোটি সালাম নেবেন। আম্মাজানকে আমার কদমবুচি দেবেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া করতে বলবেন। ফুফু আম্মাকেও দোয়া করতে বলবেন। ফয়সল, আখতার,আরজু, এ্যানী ছোটদের আমার স্নেহাশীষ দেবেন। আমার জন্য দোয়া করবেন। আর সব সময় হুশিয়ার থাকবেন।

ইতি
আপনার স্নেহের
ফারুক