ভরসার শেষ স্থলটুক্ওু নিশ্চিহ্ন হলো
-রুদ্র মাসুদ-
শনিবার রাতে (৩১ মার্চ) পত্রিকার (চলমান নোয়াখালী) মেকআপ আর পরবর্তী দুই দিন অসুস্থতার11 কারণে ঘুম হয়নি ঠিকমতো। সোমবার (০২ এপ্রিল) রাতেও ঘুমাতে সময় লেগে যায় দুইটা পর্যন্ত। অষুধ খেয়ে ঘুমানোর কারণে অকেনটাই অচেতন অবস্থায় কেটে যায় সকাল ৯টা পর্যন্ত। ঘুমের ঘোর না কাটতেই বেজে উঠে মুঠোফোন। অপর প্রান্ত থেকে ছাত্রলীগ নেতা মঞ্জুর প্রশ্ন, আপনি কিছু শুনেছেন? কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করতেই মঞ্জুর পাল্টা প্রশ্ন কেনো কিরন মামার বিষয়ে। কি হয়েছে কিরণ ভাই’র এমন প্রশ্নে জবাবে অপরপ্রান্ত থেকে ভরাট গলায় মঞ্জুর উত্তর- কিরন মামা মারা গেছে। আপনাকে কেউ জানায়নি ? আমিতো ভাবছিলাম আপনি শুনেছেন। আমি আসছি বলার পরই লাইন কাটেন মঞ্জু।
মুঠোফোনের কল লিষ্ট হাতড়ে দেখি সকাল থেকেই সাংবাদিক মঞ্জু ভাই, ফুয়াদ ভাই, বিজন দা, কামরুল মামা, পিন্টু, দিদার, নুরুল আলম মাসুদ থেকে শুরু করে কিরন ভাই কিংবা এমন কোনো পরিচিতজন নেই যার কল নেই। নিজেকে সামলে নিয়েই যখন বাসা থেকে বের হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম। এই ফাঁকে কিছুক্ষণ পর পরই মুঠোফোনে পরিচতজনরা জানাচ্ছিলেন অধ্যক্ষ কিরণের মৃত্যুর খবর। দিদারকে যখন ফোন দিলাম তখন অপরপ্রান্ত থেকে তাঁর হাউমাউ কান্নার আওয়াজে কিছুটা ভড়কে যাই।
কিছুটা স্বাভাবিক হওয়ার পর থেকে মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে অধ্যক্ষ বেলাল উদ্দিন কিরণের সাথে সম্পর্কের বিষয়টি। সোমবার সন্ধ্যায় মাইজদীর প্রধান সড়কের টোকিও ফুডে নিজেদের আড্ডায় নুরুল আলম মাসুদ বলেছিলেন- কিরন ভাই’র অফিসে গিয়ে তাঁকে বিষন্ন অবস্থায় দেখেছেন। একবার দেখা করার ইচ্ছা স্বত্ত্বেও রাত বাড়ার কারণে চৌমুহনী চলে যাই। তাই শেষ দেখা হয়নি কিরণ ভাইর সাথে। বেলাল উদ্দিন কিরণের সমালোচনা করেছি তাঁর সামনে কিংবা পেছনে। সে খবর তিনি রাখতেন, কিন্তু সেনিয়ে কখনো ক্ষুব্ধ ছিলেন না। সর্বশেষ গত অক্টোবরে সড়ক ও জনপথ বিভাগের একটি কাজ নিয়ে প্রচন্ড ক্ষুব্ধ ছিলাম তাঁরওপর। তারপরও তিনি হাসিমুখে সেটি মেনে নিয়েছেন।
দিনে ক্ষোভ প্রকাশ করেছি, সমালোচনা করেছি নিজের স্বার্থে, প্রেসক্লাবের স্বার্থে কিংবা কোনো তদ্বির নিয়ে। কিন্তু রাতেই যখন রেডক্রিসেন্টের অফিসে গেছি, দিনের সব ভুলে গেছেন। নানান ক্ষোভ স্বত্বেও নিজের কিংবা বিভিন্ন জনের তদ্বির নিয়ে গেছে তাঁর কাছে। ব্যস্ততায় হয়তো সব অনুরোধ রাখতে পারেননি। কিন্তু; সর্বোচ্ছ চেষ্টা করেছেন। একটা নিউজ নিয়ে জেলা প্রশাসক সিরাজুল ইসলামের অনুরোধে মাহবুব (প্রথম আলো) এবং আমাকে জেলা প্রশাসকের বাসভবনে নিয়ে গিয়েছিলেন কিরন ভাই। সেদিন কিরনভাইকে বলেছিলা ডিসির বাসায় গেলেতো নিউজ করা হবে না। একজন সিনিয়র সংবাদকর্মী হিসাবে তাঁর উত্তর ছিলো- নিউজ তোমাদের নিজস্ব ব্যাপার, ডিসি সাহেব বলেছেন চলো এককাপ চা খেয়েই চলে আসবো। এরআগে জেলা প্রশাসক মিজানুর রহমানের সময়ে আমিসহ সিনিয়র সাংবাদিকরা যখন মহিলা ও শিশু বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী অনুষ্ঠান বর্জন করেছিলাম। সেদিনও তিনি সাংবাদিকদের দাবির প্রতি অটল ছিলেন, একই সাথে যাথে প্রশাসনের সাথে বৈরীতা তৈরী না হয় সেজন্য সুষ্ঠু সমাধানের চেষ্টা করেছেন।
যত দুরত্বই থাক কিংবা যত ক্ষোভই থাক শেষ পর্যন্ত তিনি কাছে টেনে নিয়েছেন। শত সমালোচনার পরও বারবার ছুটে যেতে হয়েছে বেলাল উদ্দিন কিরণের কাছে, তিনি ফিরিয়ে দেননি। মোবাইলে ফোন করলেই অপরপ্রান্ত থেকে হাসতে হাসতে বলেছেন ‘কিরে বদমা’। স্নেহমাখা এমন কতো উক্তি বারবার মনের আয়না ভেসে উঠছে। দুপুরে দেখা হয়েছে এমন কোনো দিন নেই যে, না খাইয়ে ছেড়েছে। রাতেও একই চিত্র ছিলো। আমার নিজস্ব কোনো মেহমান কিংবা সমকালের কোনো মেহমান এলেও নিজের মতো করে খাইয়েছেন। দূর্যোগকালীন সময়ে সংবাদ সংগ্রহে যেতে হবে? কিরণ ভাইর সামনে পড়েছি, সাথে সাথে মাইক্রো ভাড়া বের করে দিয়েছেন দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছতে। সমকালের অনুষ্ঠান হবে নিজের পকেট থেকে আগে টাকা বের করে দিয়েছেন। এমন হাজারো উদাহরন মনের মধ্যে বারবার উঁকি দিচ্ছে আর ঝাপসা হয়ে উঠছে চোখের পাতা। কারণ ব্যক্তিগত আর্থিক টানাপোড়েন থেকে শুরু করে অন্যকারো সমস্যা নিয়ে দাঁড়ানোর শেষ ভরসাস্থল ছিলেন তিনি। মঙ্গলবার সকালে ঘুম ভেঙ্গে ছাত্রনেতা মঞ্জুর ফোন রিসিভ করার পর বারবারই মনে হচ্ছিলো আমি মনে হয় আমার একটি বিশ্বস্থ আশ্রয়/ভরসারস্থল হারালাম। যেটি কারো দ্বারা পূরণীয় নয়, কারণ অনেকেই স্নেহ করেন, কেউ দায়িত্ব নেন না। বেলাল উদ্দিন কিরন দায়িত্ব নিয়েই পাশে দাঁড়াতেন। কখনো কখনো আড়াল থেকেই। তাঁর অকাল প্রয়াণে শেষ ভরসাস্থল টুকুও নিশ্চিহ্ণ হলো !
প্রেসকাবে গিয়ে বিষাদের কান্না দেখেছি- শ্রদ্ধা এবং অনুভ‚তির জায়গা থেকে। সবশেষে নানান চিন্তা, দুঃখবোধকে ঠেলে কিরন ভাই’র বাসয় পৌঁছতে আমার সময় লেগে যায় দুপুর সাড়ে ১২টা নাগাদ। ততক্ষণে পরিচিতজনরা কেউ কেউ দুই তিনবারও কিরন ভাইর বাসায় যাওয়া হয়ে গেছে। বেলাল উদ্দিন কিরনের মরদেহ দেখে আরেকবার শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। বারবার দেখতে থাকি। তিনি কি মৃত না ঘুমিয়ে আছেন। কোনো হিসাব মেলাতে পারছিলাম না। যারা দীর্ঘদিন ধরে কিরন ভাইকে চেনেন তারা নিশ্চয়ই সেটি মানবেন- এতো সুন্দর তাঁকে কখনোই দেখা যায় নি। অদ্ভুদ এক কান্ড কিন শেভ করা কিরন ভাই যেনো কিছুটা বিশ্রামের ছলে ঘুমিয়ে আছেন। কিন্তু গভীর ঘুম, ততক্ষণে তিনি চলে গেছেন না ফেরার দেশে। দুপুর সোয়া একটার দিকে সেখান থেকে চলে আসার পরও তার মুখঅবয়বের এই চিত্রটি বারবার ভেসে ওঠে। অধ্যক্ষ বেলাল উদ্দিন কিরন উপস্থিত ছিলেন এমন অসংখ্য অনুষ্ঠান ও কর্মসূচীর ফটো তুলেছি গত কয়েক বছরে। কিন্তু কখনোই কিরন ভাই’র ছবি ভালো আসতো না। এই প্রথম তাঁকে এতো সন্দুর লাগালো তাও মৃত্যুর পর !
বেলাল উদ্দিন কিরনের মাধ্যমে টাকা দিয়ে চাকরী হয় জেলা শহরসহ গোটা জেলায় যখন এমন রটনা তখন অনেক গরীব যুবককে সরকারি চাকরি পাইয়ে দিতে দেখেছি বিনাপয়সায়। একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসাবে অধ্যক্ষ বেলাল উদ্দিন কিরণের তুলনা শুধু তিনি নিজেই ছিলেন। তাঁর জানাযায় সেটি প্রমান করেছে। জীবিত মানুষকে আমরা সম্মান দিতে জানি না কিন্তু মৃত মানুষ তাঁর কর্মের ফল পায়, মৃত্যুর মধ্যদিয়ে সেটিও আবার প্রমাণ করেছেন কিরন ভাই। আল্লাহ তাঁকে জান্নাতবাসী করুন, তাঁর মা যেনো সন্তান হারানোর, সন্তানরা যেনো পিতার এবং  স্ত্রী যেনো স্বামী হারানো শোক সইতে পারে সৃষ্টিকর্তার কাছে এটিই কামনা করি।
#
সম্পাদক, চলমান নোয়াখালী।
নোয়াখালী প্রতিনিধি, সমকাল।

বিশেষ প্রতিবেদন