কোম্পানীগঞ্জের বামনীর যুদ্ধের ৪১ বছর : ৭১'র এই দিনে শহীদ হন ৬ মুক্তিযোদ্ধা
11
রুদ্র মাসুদ-
আজ ৪ সেপ্টেম্বর। ৭১’র এই দিনে কোম্পানীগঞ্জের বামনীর যুদ্ধে শহীদ হয়েছিলেন ৬ মুক্তিযোদ্ধা। আজকের এই দিনটি তাই কোম্পানীগঞ্জবাসীর কাছে স্মরণীয়। এ যুদ্ধে শহীদদের কবরে পুস্পস্তবক অর্পন, মিলাদ মাহফিল, তৎকালীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র ও চৌমুহনী কলেজের প্রাক্তন ছাত্র শহীদ ছালেহ আহম্মেদ মজুমদারের স্মরনে আজ চৌমুহনী সরকারি ছালেহ আহম্মেদ কলেজে আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে। এছাড়া শহীদ আমান উল্যা চৌধুরী ফারুক স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে বেগমগঞ্জের কাজীর হাটে শহীদ আমান উল্যা ফারুক স্মরনে আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে।
রক্তেভেজা বামনীর যুদ্ধ-
৭১’র ৪ সেপ্টেম্বর শেষ বিকালে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএলএফ কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল ফিরছিলেন অপারেশন শেষে। চরফকিরা ইউনিয়নের বাঞ্চারাম বামনী বেড়ীঁ বাঁধের মাঝামাঝি স্থানে পৌঁছলেই রাজাকারদের নির্দেশনা মোতাবেক মুক্তিযোদ্ধাদের ওপর অতর্কিতে আক্রমন করে পাকিস্থানী হানাদার বাহিনী। পাকিস্থানী হানাদার বাহিনীর সাথে সন্মুখ যুদ্ধে দুইজন পাকিস্থানী সেনা মারা গেলেও শহীদ হন ছয় মুক্তিযোদ্ধা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের মেধাবী ছাত্র এবং নোয়াখালীর চৌমুহনী কলেজের প্রাক্তন ছাত্র সালেহ আহম্মদ মজুমদার (পরবর্তীতে তাঁরা নামানুসারে চৌমুহনী সালেহ আহম্মদ কলেজ নামকরণ করা হয়), কিশোর আমান উল্যা ফারুক, টগবগে তরুন মোস্তফা কামাল ভুলু, আব্দুর রব বাবু, আকতারুজ্জামান লাতু ও ইসমাইল। গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন আবু নাছের।
যুদ্ধ শেষে পাকিস্থানী দুই সৈন্যের মৃতদেহ নিয়ে যায় পাকিস্থানী সেনারা আর মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তায় এগিয়ে আসেন কোম্পানীগঞ্জ থানা বিএলএফ’র ডেপুটি কমান্ডার খিজির হায়াত খানের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের আরেকটি গ্রæপ।
খিজির হায়াত খানের নেৃত্বাধীন গ্রুপটি ঘটনাস্থলে পৌঁছে নিহত এবং আহতদের উদ্ধার করে। তন্মধ্যে বামনি বেড়ির ১৬ নম্বর স্লুইচ গেইট এলাকায় দাফন করা হয় শহীদ ছালেহ আহম্মেদ মজুমদার, আকতারুজ্জামান লাতু এবং ইসমাইলকে। কোম্পানীগঞ্জের মুছাপুরে নিজ বাড়িতে দাফন করা হয় মোস্তফা কামাল ভুলুকে এবং সদরের নিজ বাড়িতে দাফন করা হয় আব্দুর রব বাবুকে দাফন করা হয় রামেশ্বর পুর বেড়ির দক্ষিণ পাশে (বর্তমানে লামচি প্রসাদ)। বামনী নদীতে স্রোতের টানে ভেসে যায় শহীদ আমান উল্যা ফারুকের লাশ।
সেদিনে যুদ্ধে অংশ নেওয়া কোম্পানীগঞ্জ থানার তৎকালীন বিএলএফ’র কমান্ডার ও চৌমুহনী কলেজের ছাত্র সংসদের সাবেক জিএস আব্দুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন টিমে ১৭জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। সেদিন তাঁরা মুছাপুরে অবস্থান করছিলেন। সেখান থেকে স্থানান্তরিত হয়ে কাছারি বাজার যাওয়ার পথে বাঞ্চারাম বামনী বেড়ি মাঝামাঝি পৌঁছলে তাঁদেরকে মুক্তিযোদ্ধা খালেদ মমিন দৌড়ে এসে খবর দেন সামনে পাকিস্থানী সেনাবাহিনী তাঁদের ওপর আক্রমন করতে পারে। এখবর পৌঁছতে না পৌঁছতেই দুই দিক থেকে পাকিস্থানী সেনাবাহিনী তাদের ওপর আক্রমন করে। প্রয়োজনী গোলাবারুদ না থাকায় সন্মুখ যুদ্ধে পাকিস্থানী সেনাবাহিনীর সাথে সন্মুখ যুদ্ধে ৬জন সহযোদ্ধাকে সেদিন হারাতে হয়েছে।
স্মৃতি সংরক্ষণ-
শহীদ ছালেহ আহম্মেদ মজুমদার , ইসমাইল এবং আখতারুজ্জামান লাতুকে যে স্থানে দাফন করা হয় সেটি এখন মুক্তিযোদ্ধা বাজার নামে পরিচিত। বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান শাহাব উদ্দিন, যুদ্ধকালীন সময়ে কোম্পানীগঞ্জ থানা বিএলএফ কমান্ডার খিঁজির হায়ত খানসহ মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের মানুষের সহায়তায় তাঁদের কবরগুলোকে সংস্কার করে টাইলস দিয়ে বাঁধানো এবং ঘেরাও করে সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
এদিকে শহীদ ছালেহ আহম্মেদ মজুমদারের নামে স্বাধীনতা পরবর্তীকালে চৌমুহনী কলেজের নাম চৌমুহনী ছালেহ আহম্মেদ কলেজের নামকরণ করা হলেও সেখানে স্মৃতি সংরক্ষণের কোনো উদ্যোগ নেই। তাঁর নিজ উপজেলা বেগমগঞ্জের কোথাও নেই স্মৃতি চিহ্ন। এমনকি এই শহীদের গ্রামের বাড়িটিও ঝরাজীর্ণ।
২০১০ সালে শহীদ ছালেহ আহম্মেদ স্মৃতি সংসদের সভাপতি মাহবুবুর রহমান বাবুল কলেজ আঙিনায় এই শহীদের স্মৃতির প্রতি সম্মান জানাতে কলেজ আঙিনায় একটি ম্যূরাল স্থাপনের আবেদন করেন কলেজ কর্তৃপক্ষের কাছে। কিন্তু শিক্ষা অধিদপ্তরের অনুমোদন না পাওয়ায় গত দুই বছরেও এই উদ্যোগটি বাস্তবায়তি হয়নি।
এনিয়ে যোগাযোগ করা হলে কলেজ অধ্যক্ষ শহিদ উল্যা ভূঞা বলেন, মন্ত্রনালয়ের অনুমোদন পেলেই যত দ্রুত সম্ভব ক্যাম্পাসে শহীদ ছালেহ আহম্মেদের মূর‌্যাল প্রতিস্থাপন করা হবে।
কর্মসূচী-
বামনীর যুদ্ধের ছয় শহীদের স্মরনে কোম্পানীগঞ্জের চর ফকিরায় ইউনিয়নের ১৬নং স্লুইচ এলাকার মুক্তিযোদ্ধা বাজারে অবস্থিত শহীদদের কবরে পুস্পস্তবক অর্পন, বেগমগঞ্জ উপজেলার মীরওয়ারিশপুরে শহীদ ছালেহ আহম্মেদ মজুমদার স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে মিলাদ মাহফিল, চৌমুহনী সরকারি এস এ কলেজে আলোচনা সভা ও মিলাদ মাহফিল, বেগমগঞ্জের কাজির হাটে শহীদ আমান উল্যা ফারুক স্মৃতি সংসদের উদ্যোগে মিলাদ মাহফিল ও আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়েছে।