নোয়াখালী উপকূলে কমছে ইলিশ আহরণ !
11
রুদ্র মাসুদ, হাতিয়া থেকে ফিরে-
ভরা মওসুম চলছে তারপরও জেলেদের জালে ধরা পড়ছেনা রূপালী ইলিশ। যে ক’টি পাওয়া যাচ্ছে তাও গত বছরের একই সময়ের তুলানায় কম। জীবিকার তাগিদে জেলের সংখ্যা বাড়লেও বছর বছর কমছে আহরিত ইলিশের পরিমান। ঠিক উল্টো আবার চিত্র খরছের ক্ষেত্রে, খরছের লাগাম টেনে ধরা যাচ্ছে না কিছুতেই । তবে; বাজারে চড়া দামের কারণে জেলেরা কিছুটা খুশি হলেও নদীতে মাছ কমে যাওয়ায় চিন্তিত নোয়াখালী উপকূলের জেলেরা। তাছাড়া খরছের সাথে ইলিশ বিক্রি করে প্রাপ্ত টাকার মধ্যে বিস্তর ফারাক।
পলি জমে নদীর তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া, বিচরণ ক্ষেত্রেগুলোতে চরজাগায় পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, বৃষ্টিপাত কমে যাওয়া এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতকে ইলিশের পরিমান কমে যাওয়ার জন্য দায়ী করছেন জেলে, ইলিশের আড়ৎদার, মৎস অফিস, নদী বিশেষজ্ঞ এবং ইলিশ গবেষকরা। জেলা মৎস অফিসের গত ৩ বছরের ইলিশ আহরণের হিসাবেও দেখা গেছে একই চিত্র।
তবে; নদীতে ইলিশের পরিমান কমে যাওয়ার কথা স্বীকার করলেও বেশীরভাগ জেলেই এটিকে দেখছে11- ‘আল্লাহ প্রদত্ত’ হিসাবে। তাঁদের বক্তব্য হচ্ছে ভাগ্যে যা আছে, তা ই তো পাচ্ছি।  এসব সংকট সত্ত্বেও বৃষ্টির পরিমান বাড়লে নদীতে ইলিশের বিচরণ বাড়বে এবং ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ ধরা পড়বে বলে আশার কথা শুনিয়েছেন ইলিশ নিয়ে গবেষণা রয়েছে এমন বিশেষজ্ঞরা।
নোয়াখালী জেলা মৎস অফিসের হিসাব অনুযায়ী অর্থ বছরে মধ্যে ২০০৯-২০১০ অর্থ বছরে ২৬ হাজার ৩৭০ মেঃটন, ২০১০-২০১১ অর্থবছরে ২৫ হাজার ৪৩৭ মেঃটন এবং ২০১১-২০১২ অর্থবছরে ২০ হাজার ৫৬৮ মেঃটন ইলিশ আহরন হয়। এ হিসাব অনুযায়ী দেখা যায় প্রতিবছরই কমছে ইলিশ আহরনের পরিমান।
সোমবার বিকালে সরেজমিনে নোয়াখালী উপক‚লের সর্ববৃহৎ মাঝ ঘাট দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ার বয়ারচরের চেয়ারম্যান ঘাটে গিয়ে দেখা যায় নিষ্প্রাণ পড়ে আছে ইলিশের আড়ৎদারদের চৌকি। দু’/একটি নৌকা ঘাটে ভিড়লেই শুরু হয় হাঁকডাক। হাতিয়া উপক‚লের ছোট বড় ৩০টির বেশী ঘাটে একই অবস্থা বিরাজ করছে বলে জানান আড়ৎদাররা।
হাতিয়ার চেয়ারম্যান ঘাটে ইলিশ ধরে নদী থেকে ফেরা জলিল মাঝির মতে ‘ আগে জিয়ানে মাছ ধইরতাম হিয়ানে ২০-৩০ হা হানি আছিলো, অন হিয়ানে হানি আছে ৮-১০ হাত,। সারাদিন নদীতে থেকে ১০ পিজ ইলিশ মাছ পেয়েছে ইঙ্গিত করে মাঝ বয়সী এই জেলে জানান, গত বছরের এই সময়ে ২০-২৫পিজ ইলিশ পাওয়া যেতো।
ভোলার দৌলত খাঁ থেকে নোয়াখালী উপকূলে ইলিশ শিকারে আসা জাকির হোসেন মাঝি (৩৯)  সাথে আলাপচারিতায় জানালেন, শুক্রবার ভোরে ১০ জন জেলে ও মাঝি মাল্লা নিয়ে হাতিয়ার মেঘনা নদীতে ইলিশ শিকার করতে যান। সকাল ১০টা নাগাদ ফিরে তিনি ইলিশ পেয়েছেন মাত্র ৩টা। মাছ ধরতে গিয়ে এবং ফিরতে ছবিল (জ্বালানী ও খাবার খরছ) খরছ হয়েছে আড়াই হাজার। আর ৩টি মাছ বিক্রি করে পেয়েছেন ১৭’শ টাকা। জানালেন মাছের দাম ভালো কিন্তু কম ধরা পড়ায় খরছে পোষায়  না। তারওপর দাদন তো রয়েছেই। তবে; গত বছরের এসময়ে আরো বেশী ইলিশ ধরা পড়তো।
দৌলত খাঁর আরেক মাঝি সহিদুল  (৪৮) জানালেন ৩০ বছরের বেশি সময় ধরে নদীতে ইলিশ ধরছেন তিনি। গত বছরও হাতিয়া উপক‚লে এসেছিলেন মাছ ধরতে। তবে; গত বছর এসময়ের তুলনায় এবছর মাছ কম। ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা দাদন রয়েছে উল্লেখ করে এই মাঝি জানান, আল্লায় দেয় না এজন্য মাছ কম, আবার আল্লায় দিলে মাছ বেশী পামু। নদীতে মাছ কম ধরা পড়ার কথা স্বীকার করলেও এর কারণ হিসাবে সহিদুল মাঝির সাথে সুর মিলিয়ে একই কথা বলেন ফরিদ মাঝিও।
নোয়াখালী উপকূলের জেলে, নৌকার মাঝি ও ইলিশের আড়তদারদের সাথে কথা বলে জানা যায়, 12ইলিশ মাছ বেশী পানিতে বিচরণ করে। পলি জমে ক্রমাগতভাবে নদীর বুকে চর জেগে ওঠা এবং নদীর তলদেশের উচ্চতা বাড়ার কারণে ইলিশের বিচরণ ক্ষেত্র এবং অভয়াশ্রমগুলোতেও পানির গভীরতা কমে যাচ্ছে। যারফলে ইলিশের বিচরণ ক্ষেত্র এবং অভয়াশ্রমগুলোও ক্রমেই দক্ষিণে সরে যাচ্ছে। কিন্তু জেলেরাতো নিদিষ্ট স্থানেই ইলিশ শিকার করে থাকে। তাছাড়া সমুদ্রে মাছ আহরণের মতো সরঞ্জামও জেলেদের নেই। পাশাপাশি বৃষ্টি পাত কম হওয়ার কারণেও সাগর থেকে উপরের দিকে উঠছেনা ইলিশ মাছ। বৃষ্টি হলে এ অবস্থা কেটে যাবে এমন আশাবাদ ব্যক্ত করলেও সবাই স্বীকার করছেন বছর বছর কমছে আহরিত ইলিশের পরিমান। তবে; জেলেদের দাবি প্রকৃত্তি প্রদত্ত রূপালী ইলিশের আহরণ বাড়াতে দ্রæত সরকারি পদক্ষেপ নেওয়াও জরুরী।
নদীতে মৎস আহরণ বিষয়ে গবেষণা রয়েছে এমন একাধিক ব্যক্তি জানান, পলি পতন, পানির প্রবাহ কমে যাওয়া এবং বৃষ্টিপাত কমে যাওযার কারণে ইলিশের চলাচল কমে গেছে একারণেই নোয়াখালী উপক‚লে আপাতত ইলিশ কম ধরা পড়ছে। তাছাড়া জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে পানিতে তাপমাত্র বৃদ্ধি এবং লবনের মাত্রা বৃদ্ধির কারণেও ইলিশ কম ধরা পড়ছে।
হাতিয়ার চেয়ারম্যান ঘাটের হাতিয়া মৎস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাধারণ সম্পাদক আক্তার হোসেন বলেন, হাতিয়ার চার পাশে মাছ ঘাট এবং কোল্ডষ্টোরঘাটসহ ৩০টির বেশী ঘাট রয়েছে। এসব ঘাট থেকে ৪-৫ হাজার নৌকা নদীতে নামে ইলিশ আহরণে। তন্মধ্যে চেয়ারম্যান ঘাট থেকে ইলিশের মওসুমে প্রায় আড়াই হাজার নৌকা নেমেছে। এসকল জেলে/মাঝি-মাল্লা ভোলার দৌলত খাঁ, লক্ষ্মীপুরের রামগতি, মুন্সিগঞ্জ, শ্রীপুর, ইলিশা, ফরিদপুর, শিবচর, ঢাকার ভাগ্যক‚ল ও হাতিয়া এলাকার ।
নদীতে ইলিশ আহরণের পরিমান কমে যাওয়ার বিষয়ে জেলেদের মতামতের সাথে একাত্মতা পোষণ করে তিনি বলেন, বর্তমানে ইলিশের দাম চড়া। গড়ে প্রতি পন (৮০ পিজ) ইলিশের দাম ৩৫ থেকে ৪০ হাজার টাকা এবং বড় সাইজের ইলিশের পন ৫০-৫২ হাজার টাকায় বিক্রি হয় এখানে। তবে; ইলিশের দাম পেলেও কম ধরা পড়ার কারণে খরচ উঠানো কষ্টসাধ্য হয় অনেক সময়। তাছাড়া নদীতে ইলিশের আহরণ কম হলেও বছর বছর বাড়ছে জেলেদের সংখ্যা।
নদীতে পলিপতন সম্পর্কে ন্যাদারল্যান্ড সরকারের আর্থিক সহায়তায় পরিচালিত এ্যাকচুয়ারি ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রামের-ইডিপি’র (মোহনা উন্নয়ন কর্মসূচী) কনসাল্টেন্ট এস আর খান বলেন, সাধারণ হিসাব অনুযায়ী হিমালয় থেকে নেমে আসা পানির সাথে প্রতি বছর মেঘনা মেহনা দিয়ে ১ দশমিক ২ বিলিয়ন টন পলি নামে। এর মধ্যে এক তৃতিয়াংশ মহাসাগরে নেমে যায়, এক তৃতিয়াংশ নদীর তলদেশে জমা হয় বাকী এক তৃতিয়াংশ ঘূর্ণায়মান থাকে। এই হিসাবে নোয়াখালী উপক‚লীয় এলাকায় নদীর তলদেশের উচ্চতা বাড়ছে স্বাভাবিক নিয়মেই। এর সাথে ইলিশের প্রাপ্যতার কোনা সংশিøষ্টতা রয়েছে কিনা তা ইলিশ নিয়ে যারা গবেষণা করেন তারই ভালো বলতে পারবেন।
চাঁদপুরস্থ বাংলাদেশ মৎস গবেষণা ইনিষ্টিটিউটের সিনিয়র বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. আনিছুর রহমান বলেন, দেশে ইলিশ আহরণের পরিমান কমতির দিকে নেই। তবে; সুর্নিদিষ্টভাবে নোয়াখালী উপকূলের তথ্য তাঁর কাছে নেই।
তিনি বলেন, বৃষ্টিপাতের সাথে ইলিশের প্রাপ্যতার সম্পর্ক রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখানে মূখ্য নয়।এছাড়া নদীর নাব্যতা সংকট, বৃহৎ অঞ্চলে পানির গভীরতা কমে যাওয়া, পানির প্রবাহ, তলানী পতনের ফলে ইলিশ আহরণ কিছু কমতে পারে। তবে; হতাশার কারণ নেই, বৃষ্টি হলেই ঝাঁকে ঝাঁকে ইলিশ উঠে আসবে নদীতে।
জেলে সংখ্যা বৃদ্ধি এবং ইলিশ আহরণ কমে যাওয়ার বিষয়টি স্বীকার করে জেলা মৎস কর্মকর্তা বিলকিস তাহমিনা জানান, নোয়াখালী উপক‚লবর্তী চরগুলো বাসিন্দাদের প্রায় সবাই মাছ ধরার সাথে কোননা কোনোভাবে জড়িত। এঁরাই নদীতে নামছে ইলিশ আহরণে, জেলেদের সংখ্যা বাড়ার কারণেও জেলে প্রতি মাছ কম পাওয়ার কারণ হতে পারে।
তবে নদীতে ইলিশ মাছ কমে যাওয়ার কারণ সম্পর্কে জেলেদের মতামতের সাথেও একাত্মতা পোষণ করেন জেলা মৎস কর্মকর্তা। তবে; নাব্যতা সংকট দূরী করার জন্য ইলিশের প্রজনন ও বিচরন এলাকায় নদীতে ড্রেজিং করার গুরুত্ব তলে ধরে তিনি বলেন, এজন ইলিশের প্রজনন ও চলাফেরার ওপরও পর্যবেক্ষণ বাড়াতে হবে।
কৃষি ও অর্থনীতি