মুস্তাফিজ-জাবেদদের মত নেতৃত্ব প্রয়োজন
বিজন সেন
আমাদের দেশে অনেক সংকট যেমন রয়েছে, তেমনি অনেক সংকট উত্তরণের পথও আমরা খুজেঁ পেয়েছি। অনেক উন্নয়নের সূচকে আমরা এগিয়েছি, বাংলাদেশ আর্ন্তজাতিকভাবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে প্রশংসিত হচ্ছে। বর্তমান বিশ্বায়নের যুগে, আর্ন্তজাতিক পর্যায়ের প্রতিযোগীতায় আমাদের অনেক অর্জন11 যেমন রয়েছে, তেমনি অনেক কিছু আমরা হরিয়েছি, আবার কিছু কিছু বিষয় হারাতে বসেছি। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় একান্নবর্ত্তী পরিবার, লোকায়ত সংস্কৃতি, সামাজিক অনুশাসন, আইনশৃ্খংলা নিয়ন্ত্রনে উচ্চ মার্গের সামাজিক ব্যবস্থা ছিল। এ সকল ঐতিহ্য দ্রুত বিলুপ্ত হচ্ছে । এর ফলে সমাজে দ্রুত অবক্ষয় হচ্ছ, আমাদের গর্ব বাঙালীর নিজস্ব স্বকীয়তা আমরা হারাতে বসেছি। ভোগবাদি ও চাকচিক্যের সমাজের সাথে দৌড়াতে গিয়ে দেশের  বেশির ভাগ মানুষ কাক হয়েও ময়ূর হওয়ার মত ভেক ধরতে দ্বিধা করছেনা।
এই কথাগুলোর অবতারনা করলাম এই কারনে য়ে, প্রকৃত অর্থে আমরা অর্থনৈতিক ভাবে অগ্রসর হলেও আসল জায়গাটিতে আমরা পিছিয়ে পড়ছি। আমাদের সমাজ ব্যবস্থায় ভাল মনের মানূষগুলো এখন কোনঠাসা। সমাজের নেতৃত্বে এখন নতুন বিত্তশালীদের দাপট চলছে। দান সদকাকারীরা সমাজে কিছু দিয়ে আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে মিডিয়াতে প্রচার করে নিজের অস্তিত্বকে জানান দেয়। এরা অবদান রাখার আগেই প্রতিদান পেতে চায়। সমাজ, রাজনীতি, অর্থনীতি এরাই নিয়ন্ত্রন করে রাষ্ট্র ও প্রশাসনের সহযোগীতা নিয়ে। সমাজে মাদকের আগ্রাসন, অস্ত্রবাজি, সন্ত্রাসী লালন এ সকল কিছু উঠতি সমাজপতি ও তথাকথিত রাজনীতিকদের নিয়ন্ত্রনে হচ্ছে। তবে এর ব্যতিক্রম ও আছে। তবে তা মাইক্রোস্কপিক।
সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক  বেগমগঞ্জের (বর্তমানে সোনাইমুড়ি) সন্তান মুস্তাফিজ ভাই মারা গেছেন। রিক্ত নিঃস্ব হয়ে পরিবারকে অকুল সাগরে ভাসিয়ে চলে গেছেন। তিনি দেশকে নিজের সবটুকু উজাড় করে দিয়েছেন। দু’বারের এমপি ছিলেন, বিত্ত বৈভব করে স্বচ্ছল থাকা তাঁর কাছে প্রাধান্য পায়নি। একজন গণমানুষের নেতা হয়েই জীবন কেটেছে তাঁর। উল্লেখ্য যে, সম্প্রতি নোয়াখালীর ভোটের রাজনীতি নিয়ে একটি প্রতিবেদন লিখেছি জাতীয় দৈনিক ভোরের কাগজে। প্রতিবেদনটি প্রকাশের পর অনেক প্রশংসা যেমন পেয়েছি,তেমনি কতিপয় ব্যক্তির তীর্যক বাক্য ও হজম করেছি। বিষয়টি একজন সংবাদ কর্মীর জন্য নতুন কিছু নয়। তবে নতুনত্ব আছে আমার জন্য।  বেগমগজ্ঞ আসনে আমি বিগত জাতীয় সংসদ নির্বাচনের স্বতন্ত্র প্রার্থী মিনহাজ আহাম্মেদ জাবেদ সর্ম্পকে আমার বিবেচনায় কিছু সত্য তথ্য তুলে ধরেছিলাম। এতে ক্ষিপ্ত কতিপয় উঠতি নেতাদের টেলিফোন ও সরাসরি কথনে তারা আমার তথ্য ও বক্তব্যকে অসার প্রমান করতে পারেনি। আমি লিখেছিলাম জাবেদ সাহেব অত্যন্ত উচুঁমাপের একজন মানুষ এবং একজন নিভৃতচারি সমাজ হিতৈষী। তারঁ সাথে সরাসরি দু’দিন দেখা হয়েছে, তাও বছর কয়েক আগে। প্রথমটি নিত্যান্তই সৌজন্য সাক্ষাৎ এবং অন্যটি তাঁর নিজের অর্থে  কতিপয় দরিদ্র মুক্তিযোদ্ধা পরিবারকে গৃহ নির্মাণ করে তা হস্তান্তর করার পৃথক তিনটি অনুষ্ঠানে। প্রথম সাক্ষাতে সৌজন্যমূলক কথা শেষে তিনি জিজ্ঞেস করেছিলেন, ‘আচ্ছা বলুনতো নোয়াখালীর উন্নয়নে কি প্রায়রিটি পেতে পারে। তবে প্রায়রিটি হতে হবে দীর্ঘ মেয়াদী’। আমরা উপস্থিত সকলে কিছু কিছু বিষয় বিক্ষিপ্তভাবে বলেছি। তখন তারঁ বড় ভাই জেনারেল মঈন রাষ্ট্র ক্ষমতার অন্যতম ব্যাক্তি। জাবেদ সাহেবের সে বক্তব্য কেবলমাত্র কথার কথা ছিলনা, তাঁর প্রমান কিছু দিন পরে পেতে শুরু করি।  বেগমগজ্ঞ সোনাইমুড়ি উপজেলা ভিত্তিক সে উন্নয়ন শুরু হলেও জেলার কিছু মৌলিক বিষয় যেমন, নোয়াখালী মেডিক্যাল কলেজ, লাকসাম -সোনাইমুড়ি -বেগমগঞ্জ- ফেনী-চট্রগ্রাম সড়ক চারলেইনে উন্নীত করন, সূবর্ণচরসহ উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘিরে ইকনোমিক জোন করা এবং আরো কিছু দীর্ঘ মেয়াদি প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। এর পেছনে কুশীলবের দায়িত্বে ছিলেন, জাবেদ সাহেব।  বিগত অক্টোবর মাসের জাতীয় অর্থনৈতিক কাউন্সিল (একনেক) কমিটিতে বৃহত্তর নোয়াখালীর গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের (জিএনপি-২) জন্য সাড়ে চারশত কোটি টাকা অনুমোদন করে মন্ত্রী পরিষদে তা’ উপস্থাপন করা হয়। এই প্রকল্প অনুমোদন হওয়ার দিন বিকেলে যোগাযোগ মন্ত্রী কাদের ভাইকে একটি বিষয়ে কথা বলার জন্য ফোন করলে তিনি খুব উৎফুল্ল চিত্তে বললেন, শোন আজ নোয়াখালীর জন্য একটি প্রকল্প পাশ করিয়েছি। এ জন্য আমার অনেক বেগ পেতে হয়েছে তবে প্রকল্পটি আমার ছিলনা, প্রকল্পটি ছিল জেনারেল মঈন-উ- আহামেদ সাহেবের করা । আমি তাকেঁ ধন্যবাদ দিলাম। একজন বড় মাপের রাজণীতিক কাদের ভাই সত্য কথনের জন্য জাতির কাছে ইতিমধ্যে প্রিয়ভাজন হয়েছেন। প্রকল্পটি সম্পর্কেও যা’সত্য তাই বলেছেন। আমি যদি বেগমগজ্ঞের উন্নয়নের কথা বলি তা’হলে স্বাধীনতার পর জাবেদ সাহেবের করা কাজগুলো শ্রেষ্টতর বলা অত্যুক্তি হবেনা। একজন মানুষ যার কাছে কোন ধরনের পদ-পদবি নেই তিনি কি করে এত কাজ করলেন। নিশ্চই তার ক্যরিশম্যাটিক নেতৃত্বের গুনাবলী রয়েছে। এমন নেতা আমাদের সমাজে বিরল। এদের নার্সিং করতে হবে সমাজের প্রয়োজনে। অনেকেই এ লেখাটি প্রকাশের পর আবার তির্যকবাক্য বর্ষন করবেন, তথাপিও তাদের বিবেকের কাছে প্রশ্ন রেখে বলি, যদি জাবেদ সাহেব বাংলাদেশ সেনাবাহীনির প্রথম জেনারেল মঈনের ক্ষমতায় ক্ষমতাবান হয়ে থাকতেন, তাহলে ১/১১ সরকারের বিদায় এবং জেনারেল মঈনের অবসর গ্রহনের পরও কিভাবে আরো অনেক কাজ করেছেন বা করার মত মানসিকতা রাখছেন। আমার কাছে এর উত্তর একটাই, তা’হলো জনগনের প্রতি, নিজ এলাকার প্রতি তাঁর কমিটমেন্ট। এই কমিটমেন্ট ছিল বলেই নিজের রোজগারের অর্থে দরিদ্র মানুষের সহায়তা করতে পারছেন। তিনি অনেক অসহায় অথচ উপার্জনক্ষম ব্যাক্তিকে উপার্জনের জন্য নানাভাবে সহায়তা দিয়েছেন এবং দিচ্ছেন। বেগমগঞ্জের বহু মুক্তিযোদ্ধা পরিবার শান্তিতে ঘুমানোর জন্য একখানা ঘর পেয়েছেন। এমন অনেক তথ্য আছে যা’তিনি নিজের টাকায় করেছেন। এমন একজন সমাজ হিতৈষী মানুষের হাতেই সমাজ এবং রাজনীতি নিরাপদ হবে, যদি জাবেদ সাহেবের মত গুনী মানুষ গুলোকে আমরা মূল্যায়ন করি।
যা’হোক আমার লেখার প্রসঙ্গ জাবেদ সাহেব ছিলেন না, ছিল বর্তমান সমাজের প্রেক্ষিত নিয়ে। আমাদের করণীয় হবে মোস্তাফিজ ভাইয়ের মত নেতা,জাবেদ সাহেবের মত সমাজ হিতৈষীকে টিকিয়ে রাখা। এদের অস্তিত্ব যত বিলুপ্ত হবে,ততই সমাজ ,  দেশ গাঁঢ় অন্ধকারে ডুবে যাবে। আমরা জাতি হিসেবে অস্তিত্ব সংকটে পড়বো।           
লেখক, চ্যানেল আই ও ভোরের কাগজের নোয়াখালী প্রতিনিধি।