তরুণ আলোয় আগামির বাংলাদেশ
-প্রণব আচার্য্য-
যৌবনের রাগ-রক্ত লেলিহান শিখা জ্বলিয়া উঠিবে কবে ভারতকে আবার?- পরাধীন ভারতের মুক্তির আকাঙ্খায় কবি নজরুলর তাকিয়েছিলেন যৌবনের দিকে। তিনি জানতেন একমাত্র যৌবনের স্পর্ধিত শক্তিই সমস্ত অশুভর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাসের প্রতিটি বাঁকে মানব সভ্যতা যতবার পরিবর্তিত হয়েছে- তা হয়েছে তরুণদের নেতৃত্বে। যৌবনের অবিনাশি শক্তির তোড়ে ভেসে গিয়েছে অন্যায় ও শোষণের দেওয়াল। নজরুল জানতেন মানুষ ও মানবতার মুক্তির ইশতেহার রচিত হয় তরুনদের হাতেই। 11
আমাদের দেশের ইতিহাসের দিকে তাকালেও এ সত্য আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হাজার বছরের বাঙালির স্বাধিকার রক্ষার আন্দোলনে তরুন-যুবারাই ছিল অগ্রগামী। গত শতকের মধ্যভগ বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ সময়। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মাহন মুক্তি যুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত দেশ- এ সবই সম্ভব হয়েছে তরুণ যুবার নেতৃত্বে। একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর বাংলাদেশ নামক যে রাষ্ট্রটির জন্ম- তা সম্ভব হয়েছে আপামর বাঙালির রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের কারণে। উপনৈবেশিক প্রভুর কলমের খোচায় কিম্বা আপোষের মাধ্যমে নয়, ত্রিশ লক্ষ মানুষের প্রাণ ও সাতকোটি বাঙালির রক্তত্যাগের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে জন্ম। বায়ান্নর ভাষা সংগ্রামের স্ফুলিঙ্গ থেকে একাত্তরের চুড়ান্ত প্রতিরোধ বাঙালিকে এনে দিয়েছে স্বাধীনতা, পৃথিবীর বুকে পরিচিত করেছে আত্মমর্যাদাশীর বীরের জাতি হিসেবে। স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি একাটি অসাম্প্রদায়িক দেশ যাতে থাকবে না শোষণ বঞ্চনা, ধনী দরিদ্রের অশ্লীল বৈষম্য, যে দেশে অন্ন-বস্ত্র-বাসস্থান সহ নিশ্চত হবে মানুষের মৌলিক অধিকার সমূহ।
স্বাধীনতার বেয়াল্লিশ বছর পর আমরা যখন ফিরে তাকাই বাংলাদেশের দিকে তখন দেখি মুক্তিযুদ্ধে অনেক অর্জণই আজ ভূলুণ্ঠিত। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির আগুনে জ্বলছে জনপদ, বেড়ে চলেছে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য; স্বাধীন বাংলাদেশ যারা প্রতি ইঞ্চি মাটি রঞ্জিত শহীদের রক্তে যেই দেশে স্বাধীনতা বিরোধীরা বিচরণ করছে বীরদর্পে। দুবৃত্তায়নের রাজনীতির কবলে পড়ে বিপন্ন গণতন্ত্র। গণাতন্ত্রিক অধিকারের নামে চলছে হত্যা ও লুণ্ঠনের যথেচ্ছাচার। বিপন্ন মানুষ, বিপন্ন বাংলাদেশ।
দেশের এই ক্রান্তি লগ্নে আবারও রুখে দাঁড়িয়েছে যুবসমাজ। মানবতাবীরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত কাদের মোল্লার রায়কে কেন্দ্র করে ২০১৩ ফেব্র“য়ারিতে জেগে ওঠে ছাত্রজনতা- স্ফুলিঙ্গের মতো ছড়িয়ে পড়ে এ আন্দোলন সমস্ত দেশে। যারা হত্য করেছে আমাদেও মুক্তিকামী পূর্বপুরুষদের, ধর্ষণ করেছে, করেছে অগ্নি সংযোগ তাদের সে আত্মত্যাগের ঋণ শোধ করতে তরুণদের নেতৃত্বে আবার গড়ে উঠেছে জনমত। নষ্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে আবার আশার আলো হয়ে শ্লোগানে ফুসে উঠেছে বাংলাদেশের যৌবন।
মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করে বাংলাদেশের অগ্রগিত সম্ভব নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনার মধ্যেই লুকিয়ে আছে এ দেশের উন্নয়ন ও সমৃদ্ধির বীজ। গণতন্ত্র, অর্থনৈতিক সাম্য, অসাম্প্রদায়ির একটি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য মুক্তিযুদ্ধেও চেতনায় গড়ে তুলতে হবে আমাদের দেশকে। সেই সাথে ন্যায়বিচারের স্বার্থে মুক্তিযুদ্ধে মানবতা বিরোধীদের বিচার সম্পন্ন করা অত্যন্ত জরুরী। ২০১৩ সাল মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় ঋদ্ধ তারুণ্যের পুনরুত্থানের বছর। কিন্তু ষড়যন্ত্রকারীরা থেমে নেই। মিথ্যা রটনা ছড়িয়ে তারা প্রতিরোধ করতে চায় বাংলাদেশের পথচলা। কিন্তু যতদিন তারুণ্য জেগে থাকবে অমিত স্পর্ধান নিয়ে ততদিন অন্ধকারের শক্তিরা পরাজিত হবেই। লক্ষ্যপূরণে ২০১৪ সালেও অব্যাহত থাকবে আমাদের পথচলা।
প্রণব আচার্য্য
কবি, অনলাইন এক্টিভিস্ট।