সুবর্ণচরে সয়াবিন আবাদ কমেছ, তবুও ব্যস্ত কৃষক
11
সুমন ভৌমিক, ০৫ মার্চ ২০১৪
লোকসানে পড়ে আগ্রহে ভাটা পড়েছে সুবর্ণচরের সয়াবিন চাষীদের। গত মওসুমে সুবর্ণচর উপজেলায় সয়াবিনের বাম্পার ফলন হলেও অতি বৃষ্টির কারণে ফসল ঘরে তোলার আগেই জমিতে পচে ফসল নষ্ট হওয়ায় লোকসান গুনতে হয়েছিলো কৃষকদের। যার ফলে এবার সয়াবিনের আবাদ কমেছে সুবর্ণচরে। সরেজমিনে ঘুরে কৃষক ও কৃষি অফিস থেকে এ তথ্য পাওয়া যায়।
তবে; চলতি মৌসুমে যেটুকু আবাদ হয়েছে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আশানুরূপ ফসল পাবে এবং গত বছরের  ক্ষতি অনেকটা পুঁশিয়ে উঠতে পারবে বলে আশা কৃষকদের।
সুবর্ণচর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে কৃষকদের সাথে কথা বলে জানা যায়, গত রবি মৌসুমে সুবর্ণচর উপজেলায় সয়াবিনের বাম্পার ফলন হয়েছিল। কিন্তু ফসল ঘরে তোলার সময় হওয়া মাত্র শুরু হয় অতি বৃষ্টি। ফলে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়ে জমিতে বেশিরভাগ সয়াবিন পঁচে যায়। এতে করে কৃষক ফসল ঘরে তুলতে পারেনি। আবার যেটুকু ফসল  ঘরে তুলেছে তারও বেশিরভাগই বিবর্ণ হয়ে যাওয়ায় বাজারে ভালো দাম পাওয়া যায়নি। প্রায় কৃষককেই একারণে আর্থিক ক্ষতির সন্মুখিন হতে হয়। কেউ কেউ গত বছরের ঋণের বোঁঝা এবারও টানছেন।
কৃষি অফিসের তথ্য মতে গত মৌসুমে সুবর্ণচর উপজেলায় ৮ হাজার হেক্টর জমিতে সয়াবিন চাষ করা হয়েছে। ফলন অনুযায়ী ১১ হাজার ২০০ মে.টন উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিলো। তাদের হিসাব অনুযায়ী ৩ হাজার মে.টন ফসল জমিতে নষ্ট হয়েছে। কিন্তু কৃষকদের হিসাবে একেবারই নষ্ট হয়েছে ৫ হাজার মে.টন। ফসল বিবর্ণ হয়েছে ৭ হাজার মে.টনের মতো। এবছর উপজেলা কৃষি অফিস ৭ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে সয়াবিনের আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরলেও তাদের হিসাবে আবাদ হয়েছে ৭ হাজার ৫০০ হেক্টর জমি। তারপরও গত বছরের তুলনায় এ বছর ৫০০ হেক্টর জমিতে সয়াবিন কম আবাদ হয়েছে। যদিও কৃষকদের মতে উপজেলায় গত বছরের তুলনায় সয়াবিন এবার দেড় হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ কমেছে।
উপজেলার চরজুবলী গ্রামের সফল কৃষক নূর মোহাম্মদ ওরফে লেদু মেম্বার বলেন, গেছে মৌসুমে আবহাওয়া প্রতিকূলে ছিল। প্রথম দিকে তিনবারের মতো জমিতে বীজ রোপন করতে হয়েছে। তৃতীয় দফায় রোপনের পর গাছ হয়েছে। তিনি গত বছর ১২ একর জমিতে সয়াবিন চাষ করেছেন। শুরুর দিকে বীজ রোপনে কষ্ট হলেও ফলন হয়েছে আশার চেয়ে অনেক বেশি ভলো। কিন্তু ঘরে তোলার সময় হলেই শুরু হয় অতি বৃষ্টি, শেষের দিকে ‘মহাসেন’ নামক ঘুর্ণিঝড়েও তাঁর স্বপ্ন ভঙ্গ হয়ে যায়। দুই একর জমির ফসল পুরোটাই জমিতে পচে গেছে। আর ১০ একর জমির ফসলের মধ্যে ৭০ শতাংশ ফসল বিবর্ণ হওয়ায় বাজারে দাম পায়নি। ফলে তাঁকে ৩ লাখ টাকার মতো আর্থিক লোকসান গুনতে হয়েছে। গত বছরের ভয়ে এবার ৯ একর জমিতে সয়াবিন চাষ করেন। তবে এবার শুরু থেকে আবহাওয়া অনুকূলে ছিল। যদি এভাবে থাকে তাহলে গত বছরের সব ক্ষতি পুষিয়ে নিতে পারবেন বলে আশা করেন।
চর বজলুল করিমের হেজুরাম নাথ (৫৫) গত বছর সাড়ে ৪ একর জমিতে সয়াবিন চাষ করেছিলেন। ৮০ শতাংশই জমিতে পঁচেছে। যেগুলো ঘরে তুলেছেন তাও ছিল বিবর্ণ ফলে দাম না পাওয়ায় দুই লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে তাঁর দাবি। তিনি অভিযোগ করেন, নিজ থেকে কৃষি অফিসে না গেলে কাউকে পাওয়া যায় না। গত বছর এতবড় ক্ষতির সম্মুখিন হলেও সরকারিভাবে কোন প্রকার ভূর্তুকি বা ক্ষতিপূরণ পাওয়া যায়নি। গত বছরের ঋণের বোঁঝা তাঁকে আজও বইতে হচ্ছে। যেহেতু কৃষিই তাঁর একমাত্র পেশা, তাই ক্ষতি হওয়ার পরও এবার দেড় একর জমিতে করেছেন। যদি আবহাওয়া অনুকূলে থাকে তাহলে ভালো লাভবান হওয়ার আশা প্রকাশ করেন।
বিভিন্ন গ্রামের অসংখ্য কৃষক অভিযোগ করেন, সুবর্ণচর উপজেলা নোয়াখালীর খাদ্য ভান্ডার হিসেবে পরিচিত। কিন্তু কৃষকদের ভালোমন্দ দেখাশোনা করার মতো যেন কেউ নেই। কৃষকরা নিজেদের অভিজ্ঞতা দিয়ে নিজ উদ্যোগে বিভিন্ন ফসল আবাদ ও উৎপাদন করছেন। কোন প্রণোদনা নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ থেকে।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে সুবর্নচর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আমিরুল ইসলাম গত বছরের লোকসানের জেরে এবার উপজেলাতে সয়াবিনের আবাদ কম হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, এবার শুরু থেকে আবহাওয়া কৃষি অনুকূলে থাকায় শুধু সয়াবিন নয় সকল রবি শস্যের ভালো উৎপাদন হওয়া আশা করা যায়। কৃষককে উৎপাদনে আরও উদ্যোগী করতে কোন প্রকার প্রণোদনা দেয়া হচ্ছে না বলে কৃষকদের অভিযোগ রয়েছে- এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সরকারিভাবে যেসকল সহযোগীতা আসছে সবই সঠিকভাবে দেয়া হচ্ছে। তবে জনবল কম হওয়াতে সেবায় কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। এছাড়া কৃষকের দারপ্রান্তে পৌঁছা সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও তাঁর যতটুকু জনবল রয়েছে সেহিসেবে সর্বাত্বক সহযোগিতা করছেন বলেও তিনি জানান।
কৃষি ও অর্থনীতি