অবাধে কাটা হচ্ছে ফসলী জমির টপ সয়েল
11
সুমন ভৌমিক
নোয়াখালী জেলা সদরে অবাধে উত্তোলন হচ্ছে বালু, কাটা হচ্ছে ফসলী জমির টপ সয়েল ও সরকারি খালের বেড়ি বাঁধের মাটি। এতে একদিকে জমির উর্বরতা হ্রাস পেয়ে উৎপাদন শাক্তি হারাচ্ছে জমি এবং পরিবেশের মারাত্মক ক্ষতি সাধিত হচ্ছে। এসব মাটি ও বালু জেলা শহরে নতুন বসত বাড়ি গড়তে ব্যবহার করা হচ্ছে। সদর উপজেলার অশ্বদিয়া ইউনিয়নের অশ্বদিয়া গ্রাম, কালা চাঁদপুর, গৌপিভল্লবপুর, চৌধুরীর হাট, মুকিমপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে এ ঘটনা ঘটছে অহরহ।
কৃষিবিদরা বলছে জমির ‘টপ সয়েল’ বা উপরি ভাগের মাটি কেটে ফেলার ফলে ৪-৫ বছরের জন্য অনাবাদি হয়ে যাচ্ছে ওই জমি। একই কথা বলছে কৃষি বিভাগও। কৃষিবিদ ও সংশ্লিষ্টদের দাবি সরকারি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত বালু উত্তোলন, কৃষি জমির মাটি বিক্রি ও খালের বেড়ি কাটা বন্ধে এখনই পদক্ষেপ না নিলে জেলার কৃষি ও প্রাকৃতিক পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে। তবে; উপজেলা প্রশাসন বলছে উপজেলা পরিষদের নির্বাচনের পরে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন।  
সরেজমিনে দেখা যায়, নোয়াখালী সদর উপজেলার এইসব গ্রামে প্রতিদিন কয়েক একর ফসলী জমি থেকে মাটি কাটা হচ্ছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বাড়ির পুকুর ও অশ্বদিয়া ইউনিয়নের ওপর দিয়ে যাওয়া নোয়াখালী খাল থেকে ড্রেজিং মেশিন দিয়ে উত্তোলন হচ্ছে বালু এবং কেটে ফেলা হচ্ছে নোয়াখালী খালের বেড়ির কয়েকটি অংশ। এসব মাটি ও বালু ট্রাক-পিকআপে আনা হচ্ছে জেলা শহরের সোনাপুর, মাইজদী, হারিনারায়ণপুর, লক্ষ্মীনারায়ণপুর ও বেগমগঞ্জ উপজেলায়। ব্যবহার করা হচ্ছে বসতী স্থাপনে। এ ছাড়া প্রতিদিন অশ্বদিয়ার বিভিন্ন রুটে ৭০-৮০টি ট্রাক-পিকআপ গড়ে শতাধিকবার যাতায়াত করার কারণে কাঁচা ও পাকা সড়কগুলোতে গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে। কয়েকটি সড়ক তলিয়েও গেছে। ইউনিয়নের গৌপি ভল্লবপুর ও চৌধুরীর হাটেরর পার্শ¦স্থ নোয়াখালী খালের বেড়ির বেশ কয়েকটি স্থান কেটে পুকুরে পরিণত করেছে। ফলে বর্ষা মৌসুমে খালের পানি অতিরিক্ত মাত্রায় ফসলী জমিতে ও বসত বাড়িতে প্রবেশ করে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া জমির মাটি কাটার ফলে ৪-৫ বছর ওই জমি অনাবাদি থাকছে। জোর পূর্বক পুনরায় আবাদ করতে মাটি কাটা জমিতে অতিরিক্ত মাত্রায় সার ও কেমিক্যাল ব্যবহার করতে হচ্ছে। অনৈতিকভাবে ৪-৬ ফুট গর্তে মাটি কাটার ফলে ওই জমিনের পার্শ্বের জমি বা বাড়িগুলো ভেঙ্গে যাচ্ছে। এতে অপরাপররা ক্ষতির সম্মুখিন হচ্ছে। যারা ফসলী জমির ও খালের বেড়িবাঁধের মাটি কাটছে, পুকুর ও খাল থেকে বালু উত্তোলন করছে তাদের কাউকে পাওয়া যায়নি। স্থানীয়রাও এসব লোকদের নাম-পরিচয় বলতে রাজি হয়নি। তবে; অনেকে বলেন এসব জমির মালিক, যারা বেড়িবাঁধ কাটছে ও বালু উত্তোলন করছে তারা রাজনৈতিক প্রভাবশালী ও শহরের লোক।
কালাচাঁদপুর গ্রামের আবদুল লতিফ (৫০), গোপী ভল্লবপুর গ্রামের মিলন (৩০), অশ্বদিয়া গ্রামের ছায়দল হক (৫৫)সহ অসংখ্য ভূক্তভোগী অভিযোগ করে বলেন, সাময়িকভাবে আর্থিক লাভবান হওয়ার জন্য অনৈতিকভাবে ফসলী জমি, নোয়াখালী খালের বেড়িবাঁধ, ছড়ি খাল ও নোয়াখালী খাল থেকে বালু উত্তোলনের ফলে পাশ্ববর্তী জমি ও বাড়িগুলো ভেঙ্গে পড়ছে। শুধু এখন নয়, প্রতি বছরের শুকনো মৌসুমে এ ইউনিয়নের বিভিন্ন স্থানে অবাধে মাটি কাটা, বালু উত্তোলন ও খালের বেড়িবাঁধ কাটা চলে। আর মাটি ও বালু বোঁঝায় ট্রকা-পিকআপ চলাচলের কারণে গ্রামের কাঁচা ও পাকা সড়কগুলোতে গর্তের সৃষ্টি হচ্ছে এবং তলিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া ইতোমধ্যে কয়েকটি দুর্ঘটনাও ঘটেছে। স্থানীয় চেয়ারম্যানকে এসব বিষয়ে অভিযোগ করা হলেও কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি বলেও অনেকে অভিযোগ তুলেন।
ইউসুফ সর্দার নামের একজন মাটির ঠিকাদার বলেন, কি ক্ষতি হচ্ছে তারা তা বুঝেন না। জমির বিভিন্ন মালিক থেকে তারা মাটি কিনছেন, মালিকরা এসে জমি দেখিয়ে দেন তারা কেটে নিয়ে যান। তবে তিনি বালু উত্তোলন বা খালের বেড়িবাঁধ কাটার সাথে জড়িত নয় বলে জানান।
এ প্রসঙ্গে ৯নং অশ্বদিয়া ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান গোলাম মহিন উদ্দিন বাবু বলেন, মধ্যখানে তিনি উদ্যোগ নিয়ে এসব ফসলী জমি ও বেড়ি বাঁধ থেকে মাটি কাটা এবং বালু উত্তোলন বন্ধ করে দিয়েছেন। কিন্তু এখনওতো এসব হরহামেশা চলছে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, সহসায় ইউএনওকে সাথে নিয়ে তিনি এসব বন্ধে পদক্ষেপ নিবেন।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে নোয়াখালী সদর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ইসরাত জাহান বলেন, এ মুহুর্তে উপজেলা নির্বাচন নিয়ে তিনি ব্যস্ত রয়েছেন। নির্বাচনের ব্যস্ততা শেষ হলে সরেজমিনে গিয়ে তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করার আশ্বাস দিয়েছেন।
কৃষি ও অর্থনীতি