আজ চলমান নোয়াখালীর জন্ম দিন : বিরুদ্ধ সময়ে একযুগে প্রবেশ
রুদ্র মাসুদ
ঢাকার কাগজগুলো আমাদের খবর ছাপতে চায় না। জায়গা পেলেও গুরুত্ব পায় না, গুরুত্ব পেলেও স্থান সংকুলান হয় না। আরো কত কি। তখন টিভি চ্যানেলের সংখ্যা নেহায়েত দু/একটা। এই স্বপ্ন থেকে একটি নোয়াখালী থেকে একটি সংবাদপত্র প্রকাশের আগ্রহ জন্মে। সেটি ২০০২ সালের শেষের দিকের কথা। সেই স্বপ্নের সাথে যুক্ত হন অগ্রজ সাইফুল্যাহ কামরুল। পত্রিকার নামের সাথে ‘নোয়াখালী’ যুক্ত করে ৫টি সম্ভাব্য নামের তালিকা দিয়ে আবেদন করা হয় জেলা প্রশাসকের কার্যালের বিচার শাখায়। নাম ছাড়পত্র করাতে এবং পুলিশের বিশেষ শাখা- ঢাকা থেকে অনুমোদন নিতে খেটেছেন সাইফুল্যাহ কামরুল (বর্তমানে সময় টিভির নোয়াখালী প্রতিনিধি)। আমি নিয়মিত তদ্বিরে ব্যস্ত ছিলাম নোয়াখালীতে। না জানি কোন এক অজানা দরখাস্তে পত্রিকার অনুমোদন বাধাগ্রস্থ হয়।
২০০৩  সালের শুরুতেই অবশেষে অনুমতি মিললো সাপ্তাহিক ‘চলমান নোয়াখালী’ প্রকাশের। প্রকাশনার দিনক্ষণ নির্ধারিত হলো ২০০৩ সালের ৩০ এপ্রিল। এবার অজানা শত্রু প্রকাশ্য রূপ পেলো। প্রকাশনা অনুষ্ঠান পন্ড করতে প্রকাশ্যে অবস্থান নিলো বিএনপির প্রভাবশালী একটি পক্ষ। এর মধ্যে আমাদের সাথে যুক্ত হয়েছে মিজানুর রহমান (বর্তমানে একাত্তর টিভির নোয়াখালী প্রতিনিধি)। বাধা বিপত্তি পেরিয়ে প্রকাশনা উৎসবও হয়েছিলো।  মাঝের সময়গুলোতে আমরা অগণিত পাঠক, শুভার্থী, সহযোদ্ধা এবং সমাজ হিতৈষীর সানুগ্রহ সহযোগীতা, পরামর্শ, আর্থিক সহায়তা এবং উপদেশ পেয়েছি প্রকাশনাকে এগিয়ে নিতে। সহযোদ্ধা সাংবাদিকরা অকাতরে সহায়তা করেছেন। বিশেষভাবে স্মরণ থাকবে সাংবাদিক কবি জামাল হোসেন বিষাদ (আমার সংবাদ প্রতিদিনের সম্পাদক এবং বৈশাখী টিভির নোয়াখালী প্রতিনিধি ও সাংবাদিক জাহিদুর রহমানের (সমকালের অনলাইন বিভাগের সহসম্পাদক) কথা। আমরা কৃতজ্ঞ চিত্তে স্মরণ করছি চলমান নোয়াখালীকে এগিয়ে নিতে সবার অবদানকে। বিশেষত যেসকল ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান বিজ্ঞাপন কিংবা আর্থিক অনুদান দিয়ে কিংবা কম্পিউটার-প্রিন্টারসহ নানান সরঞ্জাম দিয়ে (নাম প্রকাশ করছি না) আমাদের প্রকাশনাকে এগিয়ে নিয়েছেন।
প্রকাশনার শুরু থেকেই আমাদের লক্ষ্য ছিলো স্থানীয় সংবাদ নির্ভর পত্রিকা করার। যেটি আজও অব্যাহত রয়েছে। আমরা চেষ্টা করেছি পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠিকে গণমাধ্যমের আলোয় আলোকিত করতে। নারী-শিশুর অধিকার, ভূমিহীন ও উপকূলীয় জনগণের জীবনমান উন্নয়ন, রাজনীতি, নির্বাচন, জলবায়ু পরিবর্তন, কৃষি, শক্ষা-স্বাস্থ্য থেকে শুরু করে স্থানীয়ভাবে মানুষের মৌলিক বিষয়গুলোকে চলমান নোয়াখালীর পাতায় জায়গা করে দিতে।
এরই মধ্যে ২০০৮ সালের ০১ অক্টোবর থেকে চলমান নোয়াখালী অনলাইনে প্রকাশনা শুরু করে। বন্ধুবর সুমিত আউয়াল সম্পূর্ণ নিজ খরছায় ও শ্রমে সেটি এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন আজও।
আজ চলমান নোয়াখালীর জন্ম দিন। ২০০৩ সালের ৩০ এপ্রিল সাপ্তাহিক হিসাবে প্রকাশ পেয়েছিলো আমাদের প্রিয় চলমান নোয়াখালী। প্রকাশনার ধারাবাহিকতায় যেটি ২০১৩ সালের ২৩ জুন দৈনিক হিসাবে প্রকাশের অনুমতি প্রাপ্ত হয়। দৈনিক হিসাবে প্রকাশের মাত্র  ৯ মাসের মাথায় আমরা হোঁচট খেলাম। আমরা দু:খ প্রকাশ করছি প্রকাশনা কমিয়ে আনার জন্য। এই বিরুদ্ধ সময়ে আজ আমরা প্রবেশ করছি প্রকাশনার একযুগে।
প্রিয় পাঠক ও বন্ধুরা একটি দৈনিক পত্রিকাকে কোন রকমের ধানাইপানাই ছাড়া বের করতে গেলে ন্যুনতম খরছের প্রয়োজন হয় সেটি যোগাড় করতেই আমাদের কাহিল অবস্থা। অথচ নোয়াখালীতে পত্রিকা প্রকাশনায় ‘চলমান নোয়াখালী’ একমাত্র দৈনিক যেটি অন্য পত্রিকার চেয়ে কম খরছে বের হয়। কারণ- আমি নিজে এবং আমার স্নেহের এবং আস্থার সুমন ভৌমিকের (বার্তা সম্পাদক ও বণিক বার্তার জেলা প্রতিনিধি) কারিগরি দিকগুলো জানা থাকা। আমরা একাই দুই-তিন জনের কাজ করে থাকি। সুমন নিজের সন্তানের মতো পরিচর্যা করে চলেছেন চলমান নোয়াখালীকে। তব্ওু পারলাম না। শুধুই আর্থিক কারণে।
অনলাইন প্রকাশনার কারণে আমরা প্রায়ই পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বসবাসকারী নোয়াখালীর বাসিন্দাদের কাছ থেকে ফোনের মাধ্যমে শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন পাই। শুধুমাত্র স্থানীয় সংবাদকে প্রধান্য দিয়ে পত্রিকা করার কারণে আমরা অভিনন্দন পেয়েছি প্রবাসীদের কাছে। কেউ কেউ সময়ে সময়ে আর্থিক কিংবা প্রযুক্তিগত সহায়তাও করেছেন। তবে; আমরা আশানুরূপ কোন সাড়া পাইনি চলমান নোয়াখালীর প্রকাশনাকে এগিয়ে নিতে। অথচ খুব বেশী অর্থের প্রয়োজন হয়না পত্রিকাটি বের করতে। চলমান নোয়াখালী সেই সহায়তার পেতে পারতো। কিন্তু পায়নি।
কৃতজ্ঞতা-
সাপ্তাহিক চলমান নোয়াখালী থেকে দৈনিকে রূপান্তরের পর যারা সংবাদ এবং বিজ্ঞাপন দিয়ে সহায়তা করেছেন সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। সহকর্মীদের মধ্যে আবুল বাসার, মাকছুদুর রহমান, সাইফুল ইসলামের কাছে কৃতজ্ঞতা। যারা শুধু সংবাদ দিয়ে নয় পত্রিকাটি পাঠকের কাছে পৌছাতেও নিরলস কাজ করছেন। যখন তখন অনুরোধে সাড়া দিয়ে বিজন দা এবং প্রণব নিয়মিত লিখেছেন আমাদের জন্য। পরামর্শ ও সংবাদ দিয়ে পাশে থেকেছেন সাইফুল্যাহ কামরুল। সহযোদ্ধাদের মধ্যে ব্যবস্থাপনা সম্পাদক দিদারুল আলম, এশিয়ান টিভির লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি আতোয়ার রহমান মনির, সমকালের চাটখিল প্রতিনিধি আনোয়ারুল হায়দার, সমকালের দাগনভূঁঞা প্রতিনিধি ইমাম হাসান কচি, ইত্তেফাকের সেনবাগ প্রতিনিধি খোরশেদ আলম, ইত্তেফাকের হাতিয়া প্রতিনিধি কৃষ্ণ চন্দ্র মজুমদার, ফোকাস বাংলার নোয়াখালী প্রতিনিধি শরফুদ্দিন শাহীন, প্রথম আলোর নোয়াখালী অফিস প্রধান মাহবুবুর রহমান, ধুমকেতুর ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক কামাল হোসেন মাসুদসহ অনেকে (ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি কারো নাম বাদ পড়ার জন্য) নিবেদিতভাবে সহায়তা করে চলেছেন। ডিজাইনের জন্য বারবার বিরক্ত করেছি স্নেহের সজীব চন্দকে, এখানে ওখানে দৌড়িয়েছে শুভ চন্দকে, আমাদের বিজ্ঞাপন ও বিপনন প্রতিনিধি রাজু প্রচন্ড ঠান্ডা এবং হরতাল-অবরোধেও পত্রিকা নিয়ে ছুটেছেন। প্রাণের মাসুদ ভাই, বন্ধু মুশফিক তানভীর রীতিমতো পরামর্শকের ভূমিকায় ছিলেন চলমান নোয়াখালীকে দৈনিক করার শুরু থেকে অফিস নেওয়াসহ নানান কাজে।
বিশেষ কৃতজ্ঞতা- মাননীয় সংসদ সদস্য, পৌরসভার মেয়র, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ, সমাজসেবক, শিল্পপতি, প্রবাসী, ব্যবসায়ী এবং সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রধানদের কাছে (নাম উল্লেখ করছিনা)। বিনম্র চিত্তে কৃতজ্ঞতা তাঁদের প্রতি।  ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি নাম প্রকাশ করতে না পারার কারণে।
শেষ করছি-
আজ সকালে মুঠোফোনে বারবার কল আসে বার্তা সম্পাদক অমৃত লাল ভৌমিক সুমনের। ফিরতি কল করতেই অপরপ্রান্ত থেকে অনুরোধ- ভাইয়া নিউজ ম্যাটার পাঠাই দিয়েন মেইলে, আমি দুপুরের পর মেকআপে বসবো। সংক্ষিপ্ত উত্তরে বললাম- আজ পত্রিকা বের হবে না। দীর্ঘ ১১ বছর যে পত্রিকা এতোটা সংকটে পড়েনি আজ এমন অবস্থার মুখোমুখি আমরা। আমি বিশ্বাস করি শুধুমাত্র আর্থিক কারণে চলমান নোয়াখালী’র প্রকাশনা বন্ধ বন্ধ হবে না।
স্বপ্ন দেখি দৈনিক চলমান নোয়াখালী আবারও ফিরে নিয়মিত প্রকাশনায় পূর্বের মতো। বিরুদ্ধ সময়ে এটি ছন্দপতন হতে পারে, স্বপ্ন ভঙ্গ নয়। বন্ধু-সুহৃদদের সহযোগীতায় আবারও দেখা হবে।