একটি হরতাল ও সিমেনের কথা
11
-রুদ্র মাসুদ-
পেশা আমাদের টেনে নিয়ে যায় নানান সংবাদ কিংবা তথ্যের খোঁজে। কখনো কৌতুহল, কখনো সর্বশেষ তথ্যটুকু যুক্ত করার প্রচেষ্টা, কখনোবা নিজেদের মধ্যে ভালো করার প্রতিযোগীতা কিংবা একটি ভালো সংবাদ পরিবেশনের নিজের আত্মতৃপ্তি। এসবই তথ্যের পেছেনে দৌড়াতে শক্তি যোগায়।
দূর্যোগ, দুর্ঘটনা, সহিংসতা কিংবা প্রাণহানীর মতো সংবাদ সংগ্রহ থেকে পরিবেশনের বিভিন্ন পর্যায়ে বিপদাপন্ন মানুষ, তাদের স্বজন, আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা অগ্রাধিকার থাকে। ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তি অথবা তাদের শোকাতুর স্বজনদের মানসিক অবস্থা বিবেচনায় থাকলেও পেশাগত কারণে বিরক্ত করতে হয় তাঁদেরও। এসব করতে গিয়ে কিছু কথা থাকে যা কখনোই সংবাদে পরিবেশিত হয় না। অগোচরে থেকে যায় অনেক দুঃখবোধ, আবেগমিশ্রিত ঘটনা কিংবা তিক্ত অভিজ্ঞতাও। এসবকে মেনেই প্রতিদিন খবরের পেছনে ছুটে সংবাদকর্মীরা। সবসময় সব খবর আলোড়নও সৃষ্টি করে না। তবুও ছুটতে হয় অবিরত।
শান্তির জেলা নোয়াখালী। আমাদের রাজনীতিবিদরা প্রকাশ্যে সভা-সমাবেশে গলাভরে এই কথাটি উচ্চারণ করেন। কিন্তু কথাট কী সত্য ? এ বছর কতগুলো হত্যাকান্ড ঘটেছে নোয়াখালীতে ? কেউ জানেন ? পুলিশ সুপারের কার্যালয়ে হিসাব আছে। নিঃসন্দেহে সেই হিসাব সুখকর হবে না। উদ্বেগ সৃষ্টি করবে একজন শান্ত মানুষের মনেও।
বিদায়ী বছরের শেষ সাপ্তাহে সেই শান্তির জেলা নোয়াখালীর জেলা শহরে হরতালে পিকেটারদের ইটের আঘাতে একজন স্কুল শিক্ষিকা নিহত হয়েছেন। ইতোমধ্যে সেটি সবার জানা হয়ে গেছে। সেই সংবাদের সাথে জড়িয়ে থাকা দুটি শিশুর অনিশ্চিত আগামিও একদিন আলোচনার পাদপ্রদীপ থেকে আড়ালে চলে যাবে। সেজন্যই ওপরে লম্বা ফিরিস্তি দেওয়া।
মাইজদীর পৌর কল্যাণ স্কুলের সামনে পিকেটারের ইটের আঘাতে নিহত স্কুল শিক্ষিকা শামছুন্নাহার ঝর্ণার দাফন হয়েছে মঙ্গলবার সকাল ১০টায় রামগতির চর পোড়াগাছা গ্রামে স্বামীর বাড়িতে। নিজের মধ্যে একধরণের সংকোচ ও দ্বিধার কারণে হত্যাকান্ডের বিষয়ে আইনী পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে সারাদিন নিহত শিক্ষিকার স্বামী শাহজাহান সিরাজকে ফোন করা হয়নি। বিকাল ৪টার পর থেকে মুঠোফোনে চেষ্টা করা হলে বারবার ভেসে আসে ‘আপনার ডায়ালকৃত নাম্বারে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না’।  
সন্ধ্যার ঠিক পূর্বমুহুর্তে সংযোগ পাওয়া যায় শাহজাহানের ফোনে। অপরপ্রান্ত থেকে কচি কন্ঠে সালাম দেয় একজন। বললেন- এটি আমার আব্বুর ফোন, ঘরে নেটওয়ার্ক থাকে না তো তাই আমি বাইরে আছি। আপনার পরিচয় ? সাংবাদিক পরিচয় জানার পর বাবাকে ডেকে দেওয়র জন্য একজনকে বলে। বাবা আসতে আসতেই কচি কন্ঠের শিশুটি জানায় সে হচ্ছেন- নিহত সামছুন্নাহারের বড় ছেলে শাহ্ মো. সিমেন। মা যখন মারা যায় তখন ছোট ভাই শাহ মো. আলী নূর প্রিন্স সাথে ছিলো। আর সে ছিলো বাড়িতে। পরীক্ষা শেষ হয়ে যাওয়ায় আগেই বাড়ি চলে আসে সিমেন। মা’র সাথে আগের দিন রোববার দিনের  তাঁর কথা হয়। মা বলেছিলো রাত ১১টার মধ্যে বাড়ি ফিরবে। কিন্তু রাত ১২টা যখন বাজে তখনও না ফেরায় ফোনে মার সাথে তাঁর সর্বশেষ কথা হয়। আর কথা হয়নি, সকালে ঘুম থেকে ওঠার কিছুক্ষণ পর মায়ের মৃত্যু সংবাদ পায় সিমেন। এভাবে কথা বলার ফাকে বাবা শাহজাহান পৌছলে তিনি ফোন নেন, কথা হয় তাঁর সাথে।
১০-১২ বছরের সিমেন কিংবা তার ছোট ভাই প্রিন্স এখনো বুঝে উঠতে পারেনি মায়ের চলে যাওয়া। মঙ্গলবার মায়ের ছবি নিয়ে বাবার সাথে তারা ছবি তুলেছে সাংবাদিকদের অনুরোধে। সেই ছবিগুলোর মধ্যে অনেকগুলো ছবি ততক্ষণে আমার ইমেইলের ইনবক্সে জমা হয়েছে। ছবিগুলো ডাউনলোড করতে করতে কথা হয় শাহজানের সাথে। দুটি ছেলেকে এতিম করে চলে গেছে তাঁদের মা, আর কারো যেনো এমন পরিণতি না হয় এমন কামনা করতে করতেই ঢুকরে উঠেন তিনি। বললেন- দুটি সন্তানের চোখের দিকে তাকাতে পারি না। কেনো এমন হলো ?
সদ্য প্রয়াত স্ত্রী শামছুন্নাহার সম্পর্কে বলেন- ‘আমি তখন খালার বাড়ি থেকে ভবানীগঞ্জ স্কুলে পড়তাম। তাঁদের বাড়ি স্কুলের পাশের ধর্মপুর গ্রামে। নবম শ্রেণীতে থাকা অবস্থায় পরিচয়, একসাথে লক্ষ্মীপুর কলেজে ডিগ্রী পর্যন্ত পড়ালেখা। তখনতো এতো মোবাইল ছিলো না। সেই জানাশোনা থেকেই বিয়ে। পরিবারে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে ঝর্ণার গুরুত্বপূর্ণ মতামত থাকতো, যৌথভাবেই আমরা সিদ্ধান্ত নিতাম’। দ্রুত কথাগুলো শেষ না করতেই কন্ঠ ভরাট হয়ে আসে শাহজাহানের। আমিও একসময় সালাম দিয়ে ফোনটা কেটে দিই।
এরপর যখন ঢাকায় প্রেরণের জন্য সংবাদ লেখা শুরু করি। ঘুরে ফিরে মাত্র কয়েক মিনিটের ফোনালাপ বারবার কানে বাজতে থাকে। শাহজাহানের দুই শিশু সন্তান কিংবা তাঁর এই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারবো না। ক্ষমতা দখলের আর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার রাজনৈতিক লড়াইয়ের মাঠে শামছুন্নাহররা বারবার বলি হচ্ছে, আগামিতেও হবে। কিন্তু সিমেন কিংবা প্রিন্সের যে অপূরণীয় ক্ষতি হয়েছে তা আমরা ক’দিন মনে রাখবো। পেশাগত প্রয়োজনেই আমাদের সামনে নতুন নতুন ঘটনা আসবে, আবার আমাদের ব্যস্ততা বাড়বে নতুন কোন সংবাদকে ঘিরে। ভুলে যাবো শামছুন্নাহারের মৃত্যুর খবরও। প্রকৃত হত্যাকারীরা ধরা পড়বে, হয়তো বিচারও হবে। কিন্তু ঘৃণ্য রাজনীতি কখনো বন্ধ হবে ? হরতালে মানুষ খুনের এই মনোবৃত্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কথিত শান্তির জেলা নোয়াখালীতে যেনো গণতান্ত্রিক অধিকারের লেবাসে হরতাল এবং রাজনীতির নামে যেনো আর কোন নিরীহ মানুষকে শামছুন্নাহারের মতো মৃত্যুবরণ করতে না হয় এমনটি নিশ্চিত করতে হবে জেলার রাজনীতিবিদদেরই। কারণ যার যায় সেই বুঝে আসলে ক্ষতি কতটুকু। অন্তত আর কোন সিমেন কিংবা প্রিন্সের ভাগ্যবরণ যেনো করতে না হয় কোন শিশুকে, সেটির জোর দাবি জানাচ্ছি।
শুরুতে বলেছিলাম পেশাগত কারণে ক্ষতিগ্রস্থ মানুষ কিংবা শোকাতুর স্বজনের প্রতিক্রিয়ার জন্য পেশাগত কারণে তাঁদের সাথে কথা বলার চেষ্টা করি আমরা। সেই জন্যই শাহজাহান সিরাজের সাথে কথা বলা। স্ত্রীর প্রতি তাঁর অসীম ভালোবাসা এবং সন্তানদের প্রতি তাঁর দায়িত্ববোধ সিমেন এবং প্রিন্সকে আলোকিত আগামির পথে এগিয়ে নিবে এমন প্রত্যাশা থাকবে।