শোকহীন নতুন বছরের প্রত্যাশা
-প্রণব আচার্য্য-
যে পিতা সন্তানের লাশ সনাক্ত করতে ভয় পায়
আমি তাকে ঘৃণা করি-
যে ভাই এখনও নির্লজ্জ স্বাভাবিক হয়ে আছে
আমি তাকে ঘৃণা করি-
যে শিক্ষক বুদ্ধিজীবী কবি ও কেরাণী
প্রকাশ্য পথে এই হত্যার প্রতিশোধ চায় না
আমি তাকে ঘৃণা করি-
(নবারুণ ভট্টাচার্য)
কিছুই আর আগের মতো নেই। রাজনীতি অর্থনীতি সমাজ ব্যবস্থা চিন্তা-পদ্ধতি- সব কিছু আমূল বদলে গেছে। অবশ্য বদলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক। প্রাচীন ব্যবস্থা বদলে নতুন ব্যবস্থার দিকে এগিয়ে যাওয়ার নামই প্রগতি। সমাজ সভ্যতা এভাবেই এগিয়ে চলেছে। কিন্তু বিগত দিনগুলোতে যা কিছু বদলেছে এ দেশে তাকে কোনভাবে প্রগতি বা কল্যাণকর বলার সুযোগ নেই।
বাংলাদেশ পরিণত হয়েছে এক মৃত্যুপুরীতে। মৃত্যু তার বীভৎসতম রূপ নিয়ে হাজির হয়েছে এ দেশে। আগুনে পুড়ে, পানিতে ডুবে, ভবন ধ্বসে, আততায়ীর হাতে, নদীতে ভেসে উঠে, সড়ক পথে মৃত্যুর জয়জয়কার। মা তার অসুস্থ সন্তানকে দেখতে এসে দগ্ধ হয়ে পড়ে থাকেন হাসপাতালে, স্কুল শিক্ষিকা নিহত হন পিকেটারের ইটের আঘাতে। সম্ভবত এরকম কোন ভয়াবহ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে কবি নবারুণ ভট্টাচার্য একসময় লিখেছিলেন, এই মৃত্যু উপত্যকা আমার দেশ না, এই জল্লাদের উল্লাস মঞ্চ আমার দেশ না, এই রক্তস্নাত কসাইখানা আমার দেশ না ...
এই আমাদের বাংলাদেশ। জল্লাদের উল্লাস মঞ্চে আমাদের বেঁচে থাকা। মাঝে মাঝে মনে হয় আমরাও বেঁচে আছি কোন এক পাইপের অতলে পতিত হওয়ার জন্য। যেখান থেকে উদ্ধার হবে শুধু আমাদের লাশ। আর উপরে চলতে থাকবে রাজনীতির গণিত।
রাত পোহালেই খ্রিস্টীয় বর্ষপঞ্জির নতুন বছর। নতুন মানে নতুন দিন, নতুন আশা। আমাদের সামনে যখন আরো একটি নতুন বছরের হাতছানি তখন আমরা নতুন কোন আশায় উদ্বেলিত হতে পারছি না। আমাদের স্বপ্নেরা পথে পথে নিহত হয়ে পড়ে আছে।
কিন্তু এভাবে আর কতকাল বয়ে চলবে শবের স্রোত? নষ্ট আর ক্ষমতা-লিপ্সু কিছু মানুষের হাতে আর কতদিন বন্দী থাকবে ১৬ কোটি মানুষ? নতুন মাস আসে, নতুন বছর আসে, ক্যালেন্ডার আসে; কিন্তু আমাদের নতুন দিন আসবে কবে? যেদিন আর মৃত্যুর মানুষকে নিয়ে খেলা করবে না, মানুষ শিকার হবে না নষ্ট রাজনীতির। শুনেছি মানুষ যখন রুখে দাঁড়ায় তখন সব অন্যায় বালির বাঁধের মতো ভেসে যায়। তাই আমি মানুষের দিকে চেয়ে আছি; বিশ্বাস করি একদিন মানুষ রুখে দাঁড়াবেই। নিশ্চই একদিন আমরা উদযাপন করতো পারবো শোকহীন নতুন বছর।