শ্লোগান কন্ঠে নিয়ে নিয়ে ত্রিশ বছরের পথচলা
-রুদ্র মাসুদ-
শুধুমাত্র সংগীত চর্চা কিংবা শখের বশে গান শেখার জন্য নয়। একেবারে সাংগঠনি11কভাবেই যাত্রা। আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে তখন বড়জোর সপ্তম কিংবা অষ্টম শ্রেণীর ছাত্র। একা একা বাড়ি থেকে ছয় কিলোমিটার দুরে চৌমুহনীতে এসে দুর্ণিবার খেলাঘরের সাপ্তাহিক আসরে অংশ নিতেন আবুল ফারাহ পলাশ। সেই থেকে শুরু, সংগীত চর্চার পাশাপাশি চলে সাংগঠনিক চর্চা। ঢাকা মহানগর কমিটিতে অন্তর্ভুক্তি, কেন্দ্রীয় কমিটিতে অন্তর্ভূক্তি, জাতীয় পৌষ মেলা ও জাতীয় নবান্ন উৎসব কমিটি, সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটের কেন্দ্রীয় কমিটি, জাতীয় রবীন্দ্র সংগীত সম্মিলন পরিষদের কেন্দ্রীয় কমিটিতে ঠাঁই করে নেওয়ার পাশাপাশি রবীন্দ্র সংগীতে ছায়ানটের সার্টিফিকেট কোর্স সম্পন্ন করা এবং গত ১৬-১৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত খেলাঘরের জাতীয় সম্মেলন-২০১৫ এ সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছেন বেগমগঞ্জের কৃতি সন্তান আবুল ফারাহ পলাশ।
বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে প্রধান অতিথি হিসাবে উপস্থিত থেকে সম্মেলনের উদ্বোধন করেন মাননীয় রাষ্ট্রপতি এডভোকেট আব্দুল হামিদ। সম্মেলন পুনরায় সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন অধ্যাপিকা পান্না কায়সার।
পলাশের যাত্রাকালীণ সময়ে নোয়াখালীর প্রধান বাণিজ্য কেন্দ্র চৌমুহনীতে শিশু সংগঠন খেলাঘরগুলোর ব্যাপক তৎপরতা ছিলো। মেধাবী এবং সৃজনশীলদের প্রতিদ্বন্ধিতায় মুখর থাকতো চৌমুহনীর সাংস্কৃতিক অঙ্গন। সেই সময় থেকেই ‘মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন প্রজন্ম গড়ে তোল’ ‘আমরা কারা, শান্তির পায়রা’ ‘পাড়ায় পাড়ায় খেলাঘর, গড়ে তোল গড়ে তেলা’ ‘এসো গড়ি খেলাঘর, এসো গড়ি বাংলাদেশ’ এই শ্লোগানগুলো কন্ঠে তোলেন পলাশ। দীর্ঘ ত্রিশ বছরের পথচলায় এখনো উচ্চকন্ঠে শ্লোগান তোলেন দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের শাখা আসরগুলোর আয়োজনে অংশ নিয়েও। দীর্ঘ এই পথচলায় সংগীতের হাতেখড়ি দেওয়া অগ্রজদের কিংবা দিনের পর দিন অথবা রাতের পর রাত ভিন্ন সংগঠন করা স্বত্ত্বেও যাদের সাথে শুধুমাত্র শিশুদের মননশীলতার বিকাশে কাজ করেছেন তাদের কথা ঘুরে ফিরে তুলছেন আলোচনায়।
বেগমগঞ্জের গোপালপুর ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের এক প্রগতিশীল পরিবারে জন্ম আবুল ফারাহ পলাশের। বাবা-মা দুজনেই সরকারি চাকুরে।
আলাপকালে সফল শিশু সংগঠক আবুল ফারাহ পলাশ জানালেন- সেই ছোট্ট বয়সে চৌমুহনীতে গান শিখতে আসতেন এলাকার আরো একজনের সাথে। প্রথম গান শেখা বেগমগঞ্জের কৃতি সংগীত শিল্পী ফৌজিয়া সুলতানা সম্পা’র কাছে। এরপর বরেণ্য রীবন্দ্র সংগীত শিল্পী সংস্কৃতিজন সঙ্গীতজ্ঞ অধ্যাপক রমানাথ সেনের কাছেও চৌমুহনী গণমিলনায়তন সংগীত বিদ্যলয়ে গান শিখেছেন। এরইমধ্যে ১৯৮৮ সালে এসএসসি পাস করার পর ভর্তি হন চৌমুহনী সরকারি এস এ কলেজে। সেই থেকে পুরোদমে শুরু হয় সংগঠন চর্চা। ১৯৯২ সালে দুর্ণিবার খেলাঘরের সাংস্কৃতিক সম্পাদক নির্বাচিত হন। সংগঠন চর্চার ধরাবাহিকতায় ডিগ্রী পাস করার পর ওই বছরই উচ্চ শিক্ষার জন্য পাড়ি জমান ঢাকায়। জগন্নাথ কলেজে মাস্টার্সে ভর্তি হন, একই সাথে ঢাকা মহানগরের সদস্য হিসাবে কাজ শুরু। একই সাথে কেন্দ্রীয় খেলাঘরের সাথেও কাজ শুরু হয়। মহানগরের সদস্য, সাংস্কৃতিক সম্পাদকের দায়িত্ব পালন। এরপর সাংগঠনিক ধারাবহিকতায় কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এবং ২০০৮ সালে যুগ্ম সম্পাদক নির্বাচিত হন। সর্বশেষ কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক। একই সাথে লেখাটির শুরুতে উল্লেখ করা জাতীয় পর্যায়ের সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর বিভিন্ন পদে দায়িত্ব পালন করেন আবুল পারাহ পালাশ। এ সুদীর্ঘ সময়ে দেশের প্রতিটি জেলা- উপজেলা  ও বিভাগীয় শহরে খেলাঘর আন্দোলনের একনিষ্ঠ কর্মী হিসাবে কাজ করেছেন তিনি। নিজ জেলা নোয়াখালীতে আন্তর্জাতিক ক্যাম্প আয়োজন, গণসংগীত উৎসব, বিজয় উৎসব থেকে শুরু করে নানা আয়োজনে কেন্দ্র থেকে নিবিড় সহযোগীতা করেছেন।
দীর্ঘসময়ে সাংস্কৃতিক আন্দোলন ও সংগঠন চর্চায় যাদের সহচার্য, সহযোগীতা এবং উৎসাহ আজকের এ পর্যায়ে নিয়ে গেছে পলাশকে তাদেরকেই সবচেয়ে বেশী অনুভব করেন পলাশ। যাদের মধ্যে আশীষ সাহা, কাকন সাহা, সুমন মজুমদার, সুব্রত রায়, মজিবুর রহমান, দিপক আইচসহ দীর্ঘ সময়ে পথচলায় বেগমগঞ্জ তথা চৌমুহনীর সেই খেলাঘর সংগঠকদের কথা ঘুরেফিরে আলোচনায় তোলনে তিনি। শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করেন অধ্যাপক বিপ্লব সাহা এবং মাখন লাল সাহা’র কথা।
অধ্যাপিকা পান্নায় কায়সারের ¯েœহভাজন আবুল ফারাহ পলাশ সারাদেশে শিশুদের প্রাণপ্রিয় সংগঠন খেলাঘরের মাধ্যমে মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে ছড়িয়ে দিতে চান পাড়ায় পড়ায়। আগামি প্রজন্মকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানান দেওয়া, বাঙালীর লোকায়ত এতিহ্যকে ধারণ করে অসাম্প্রদায়িক-প্রগতিশীল দেশ গড়তে খেলাঘর আন্দোলনকে এগিয়ে নিতে চান অগ্রজদের মতো করেই।
শুভকামনা থাকবে বেগমগঞ্জের কৃতি সন্তান আবুল ফারাহ পলাশের প্রতি।