হৃৎকথন : নিউ ইয়র্কের ওজন পার্কে পথমেলা ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠান দেখা এবং পেলে আসা গ্রামীণ সাংবাদিকতা
11
-রুদ্র মাসুদ-
শনিবার নিউইয়র্ক সময় সকাল ১০টায় জেএফকে বিমান বন্দরে নামলাম আমি আর আমার বুড়ি মা ‘সারা’। দীর্ঘ আট মাস পর প্রিয়তমা স্ত্রীর সাথে দেখা। পেছনে ফেলে এসেছি মা, মাটি আর লাল সবুজের পতাকা। বাবার কবর আর মা’র জন্য প্রিয় বাংলাদেশের প্রতি আমার পিছুটান বিমানে ওঠার প্রায় একমাস পূর্ব থেকেই শুরু হয়। ঘনিষ্ঠরা দেখেছেন সেটি চোখের পানিতে নিজেদের এবং আমার চোখে। এরসাথে যুক্ত হয়েছে দীর্ঘ ষোল বছরের এক বর্ণাঢ্য সাংবাদিকতা জীবন। যেখানে শুধুই প্রাপ্তির দীর্ঘ তালিকা। কানাকড়ি বাদ দিলে সেই তালিকা বিয়ের সদাই করার জন্য মুদি দোকানের দীর্ঘ তালিকার চেয়ে কয়েক’শ গুন লম্বা হবে।
বিমান বন্দরে স্ত্রীর সাথে আমার বুড়ির খালা-খালুরাও এসেছিলেন। উনাদের সাথে উডহেভেনের বাসায় গিয়ে উঠলাম। এখনকার আবহাওয়া দেশের মতোই। তবুও দেশতো আর নয়। প্রতিদিন বিকাল থেকে নিউজ পাঠানোর যে তোড়জোড় ছিলো হঠাৎ করেই সেটি অনুভব করলাম। কিন্তু আর্থিক দিক থেকে লোকসানি সাংবাদিকতার জন্য বুকের মধ্যে ঢুকরে উঠলেও মুখে প্রকাশ করতে পারিনি। আমার ঘনিষ্ঠ স্বজনরা আমার সাংবাদিকতা নিয়ে কিছুটা ক্ষুব্ধ। কারণ সোনালী সময়ের সাথে জমিজমা সবই খুইয়েছি এই সাংবাদিকতার পেছনে। তবুও ক্ষুব্ধ স্বজনরা মুখে কিছু বলেনা। কারণ এই সাংবাদিকতা আমাকে যে সম্মান দিয়েছে এতে তারাও সমানভাবে গর্বিত। সেই সুবাধে ক্ষোভও মিইয়ে যায়। সেজন্যই গুপ্ত ক্ষোভকে চাপা দিয়ে স্ত্রীও প্রকাশ্যে সমর্থন জানায় সন্ধ্যার আলাপচারিতায়। 12
রাতে বুড়ির বড় খালার বাসায় দাওয়াত খেয়ে বাসায় ফিরলাম। দু’চোখের পাতাতো এক হয় না। মনে হয় তিস্তা ব্যারেজ দিয়ে আনলিমিটেড গতিতে ছুটছে পানি। এ যাবত কালের সকল রেকর্ড ভেঙ্গে। পরদিন ছুটি থাকায় সাজু’র (স্ত্রী) তাড়া ছিলো না। বেচারী কিছুক্ষণ পরপর ঘুম ভেঙ্গে শুধু চোখ  মুছে দিচ্ছে। এভাবেই ভোর হয়।
পরদিন ১০ মে রোববার ওজন পার্কের ৮৬ স্ট্রিটের একটি বাসা দেখতে গিয়েছিলাম আপার (বুড়ির বড় খালা) সাথে আমরা তিনজন (আমি, সাজু আর বুড়ি)। বাড়ি দেখা পর্ব শেষে হাটতে হাটতে লিবার্টির দিকে গেলাম। বাঙালী দোকান থেকে সব্জি কেনার পর হাঁটছিলাম। আমাকে স্বাভাবিক করার জন্য সাজু জানায় এখানে বৈশাখী মেলা চলছে যাবো কিনা।
মনে পড়ে যায় এই পহেলা বৈশাখেও মাসুদ ভাই’র (নুরুল আলম মাসুদ) বাসায় পান্তা ইলিশ উৎসবের কথা। মুন্নি আপার পাঁচ তারকা বৈশাখী আয়োজন বরাবরই ঐতিহ্যপূর্ণ। আউয়াল ভাই, নব দা, জামান ভাই, জাহের কাকা, দিদার, বিষাদ, মঞ্জু, সুমন, সজীব এবং সবশেষে কাজল এসে যোগ দেয়। আমি আর বুড়ি রাধা চক্করে (নাগরদেলা) চড়ার জন্য দ্রুত প্রস্থান করি। সেই দুর্লভ ছবি তোলার জন্য কোন রকম দু’চারটা খেয়েই সজীবও হাজির নোয়াখালী কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার চত্বরের মেলায়। রাধা চক্করে এই জীবনে দুইবার চড়েছি, দুইবারই বুড়ির উচিলায়। সজীব ছবি তুললো আমরাও ফিরে আসলাম।
নগদ এসব স্মৃতি বারবার চোখের সামনে ভাসছে আর পা চালিয়ে আমরা পৌছলাম লিবার্টির বৈশাখী পথমেলায়। ওজন পার্ক লিজেন্ড বাউল এসোসিয়েশনের আয়োজনে তখনো মেলার প্রস্তুতি পর্ব চলছে। মঞ্চে দুইজন বসে আর সাউন্ড সিস্টেমে বেজে চলেছে বাউল গান। ৮-১০টি দোকানে বাঙালী পোষাক আর খাবার দাবার নিয়ে পসরা সাজিয়েছে। আরো দোকান বসানোর কাজ চলছে। এসব ঘুরে ঘুরে দেখছি আর মনের মধ্যে উঁকি দিচ্ছে একটি সংবাদ রচনার আগ্রহ। ছবি তুললে কে, কি বলে। আমার কার কাছে মেলার তথ্য পাবো। এসব জানার যেমন আগ্রহ, তেমনি বাসায় ফেরার তাড়াও আছে। এদিকে মেলা জমবে বিকালে। রিপোর্ট করতে হলেও পুরো সময় অপেক্ষা করতে হবে। এমন চিন্তু মাথায় ঘুরপাক খেতে খেতেই পকেটে হাতচালাই মুঠো ফোনের জন্য  (ফোনটির মালিক আমার বুড়ি মা)। শেষ পর্যন্ত অসমাপ্ত মঞ্চের ছবি তুললাম। কিন্তু কারো সাথেই তো কথা হয়নি, তাহলে লিখবো কি ? যাক বাসায় ফিরলাম, কিছু একটা লিখবো। কিন্তু ল্যাপটপে চার্জ নেই। চার্জার এদেশের কোন বোর্ড কিংবা মাল্টিপ্লাগে লাগে না। রীতিমতো মাথায় বাজ পড়েছে। এবার অপেক্ষার পালা কখন চার্জার কিনবো।
মঙ্গলবার বিকালে একটা বড় ইলেক্ট্রনিক্স (পিসিসহ সবধরণের) দোকানে গিয়ে ৩০ ডলার দিয়ে মাল্টিপ্লাগ কিনলাম। অথচ আমার দোকানের দুই’শ টাকার একটা মাল্টিপ্লাগ আমি ঢাকায় এনেও ফেলে এসেছি। যাক বাসায় গিয়ে দেখলাম এতে কোন কাজ হয়নি। সেটি ফেরত দিয়ে আজ একটা বাঙালী দোকান থেকে ২০ ডলারে একটা কিনে চার্জ দিলাম।
এতো লম্বা ফিরিস্তি দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে লেখালেখির প্রতি অদম্য ইচ্ছা আর গত ক’দিনের বিচ্ছিন্নতার কারণে। দীর্ঘ ষোল বছরের ভালোবাস জড়িয়ে আছে কালো হরফের সাথে। এর সাথে পথে চর-গ্রাম আর শহরের প্রান্তরে ঘুরে বেড়ানোর বিষয়টি। প্রথম প্রথম বলপয়েন্ট আর পরবর্তীতে কী বোর্ডের বোতামগুলোই তো সম্বল। এখানেও তাই নিজের প্রথম আগ্রহের বিষয়টি সাংবাদিকতা। অবশ্য যদি সুযোগ থাকে। কারণ প্রান্তিক পর্যায়ে কাজ করা একজন সংবাদ শ্রমিক (কবি-সাংবাদিক জামাল হোসেন বিষাদ ভাই’র ভাষায়) যেখানে তাঁর কর্মস্থলে সবচে বেশী বঞ্চনা ও ঠকেছি সেখানে এই অচেনা শহরে কে দিবে সেই সুযোগ ? অবশ্য প্রিয় সাকী ভাই’র (হাসানুজ্জামান সাকী) কাছে সেই আগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ করেছি ইতোমধ্যে।
ওজন পার্কের পথমেলা ও বর্ষবরণ অনুষ্ঠানটির প্রস্তুতি পর্ব দেখলেও এটি আমাকে লেখার সুযোগ করে দিয়েছে। এই লেখাটির সমাপ্তি টানতে পারছিনা বিধায় শুধু লম্বা হচ্ছে। আর বারবার মনে হচ্ছে সত্যিকারের সাংবাদিকতার পাঠস্থান হচ্ছে গ্রাম। কারণ সেখানে কাজ করা মফস্বল সাংবাদিক নামের অচ্যুত মানুষগুলো নিজেরাই নিজেদের এসাইনমেন্ট তৈরী করেন, ইস্যু নির্ধারণ করেন, ফলোআপ করেন। একই সাথে তারা রাজনীতি, অধিকার, চর দখল কিংবা শ্মসান দখল, নিয়োগ বাণিজ্য, টেন্ডার (পিসি) বাণিজ্য, অস্ত্রবাজি, গ্রেফতার বাণিজ্য, সাফল্য গাঁথা, অধিকার, বঞ্চনা, সাম্প্রাদায়িকতা, ক্রীড়া, দূর্যোগ, জলবায়ু পরিবর্তন, বিনোদন, শিক্ষা, নির্বাচন, অপরাধ, আইন-আদালত, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, যোগাযোগ থেকে শুরু করে সবইস্যুতে কাজ করে। অথচ ঢাকায় এসবের জন্য বিট অনুযায়ী ৩-৪জনও কাজ করে।
তারপরও মফস্বল সাংবাদিক বলে সব প্রতিষ্ঠানেই উপেক্ষার স্বীকার হয় আমাদের গ্রামীন সাংবাদিকরা। ঢাকার ডেস্কের লোকজন থেকে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার ঝুলি বেশ সমৃদ্ধ হলেও সেসবের স্বীকৃতি মেলে কদাচিৎ। ষোল বছরে আমিও এসবের স্বীকৃতি পাইনি নিজ প্রতিষ্ঠান থেকে।
কিন্তু; পাঠক তথা জনগণের যে  অসামান্য ভালোবাসা পেয়েছি সেটি নোয়াখালীর সাংবাদিকতার ইতিহাসে কোন জীবিত ব্যক্তির ভাগ্যে জুটেছে বলে মনে হয় না। সহকর্মী ও বন্ধুদের আবেগই আমাকে ওজন পার্কের মেলার আয়োজনকে সাংবাদিকতার চোখ দিয়ে দেখতে ভরসা জুগিয়েছে। যদি সাংবাদিকতা না করতে পারি, অন্য পেশায় থাকলেও চেস্টা করবো লেখালেখি চালিয়ে যেতো। হয়তো সময় লাগবে, তবুও যাতে চেষ্টা অব্যাহত থাকে এই গ্রামীণ সংবাদ শ্রমিকের সেই দোয়া কামনা করছি সবার কাছে।
পুনশ্চ: লেখায় ধারাবাহিকতা না থাকায় ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি।
-রুদ্র মাসুদ
সম্পাদক ও প্রকাশক
দৈনিক চলমান নোয়াখালী।
সাবেক নোয়াখালী প্রতিনিধি, দৈনিক সমকাল।