সম্মিলিত প্রয়াসে নির্মাণ হলো চন্দ্রগঞ্জ থানা ভবন
11
বিশেষ প্রতিনিধি, লক্ষ্মীপুর
লক্ষ্মীপুরের চন্দ্রগঞ্জ থানা ভবন নির্মাণে স্বেচ্ছায় কেউ অর্থ, ইট, বালু, রডসহ নানা নির্মাণ উপকরণ সরবরাহ করেছেন; কেউবা ভবন নির্মাণে দিয়েছেন স্বেচ্ছাশ্রম। সরকারিভাবে থানার জন্য বরাদ্দ হয় এক একর ৫২ শতাংশ জমি। এর ওপর চন্দ্রগঞ্জ থানা ভবন নির্মাণ সম্পন্ন হয় স্থানীয়দের আন্তরিক ও সার্বিক সহযোগিতায়। ব্যয় হয় ৪০ লাখ টাকা। নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠায় পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণের সম্পৃক্ততার এ দৃষ্টান্তকে অনেকেই ব্যতিক্রমী বলে মনে করেন। তাই অনেকটা শান্তি ও নিরাপত্তা ফিরেছে লক্ষ্মীপুরে।
পাঁচ উপজেলা নিয়ে গঠিত লক্ষ্মীপুর জেলায় ১৮ লাখ মানুষের বসবাস। একসময় ১৮টি সন্ত্রাসী বাহিনীর কাছে জিম্মি হয়ে পড়ে এখানকার রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, প্রবাসীসহ সমাজের সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে লক্ষ্মীপুর সদর উপজেলার বশিকপুর, দত্তপাড়া, হাজিরপাড়া, চরশাহী, চন্দ্রগঞ্জ, উত্তর জয়পুর, কুশাখালীসহ পূর্বাঞ্চলের পাঁচ লাখ মানুষ ছিলেন এসব বাহিনীর অত্যাচারে অতিষ্ঠ। এলাকায় চুরি, ডাকাতি, চাঁদাবাজি ও খুনের ঘটনা ছিল নিত্যনৈমিত্তিক। এমন কোনো দিন ছিলো না যেদিন কোনো সন্ত্রাস বা খুনোখুনি হয়নি। সন্ত্রাসী বাহিনীর হাতে ২০১২ ও ২০১৩ সালে ৪৩টি খুন, ৩৪টি ডাকাতি, জনতা বাজার ও কুশাখালীতে গণপিটুনিতে ডাকাত সন্দেহে দু'জন নিহত হয়। ধর্ষণ ও নারী নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ২১৭ জন। বেসরকারি এ তথ্যের চেয়ে অপরাধের সংখ্যা দ্বিগুণ ছাড়িয়ে
যাবে, এমন অভিমত স্থানীয়দের। এই প্রেক্ষাপটে বশিকপুর, দত্তপাড়া, হাজিরপাড়া, চরশাহী, চন্দ্রগঞ্জ, উত্তর জয়পুর ও কুশাখালী এলাকার আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়নে চন্দ্রগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রকে চন্দ্রগঞ্জ থানায় উন্নীত করার সিদ্ধান্ত নেয় সরকার। এর পরের ঘটনা রীতিমতো গল্পকেও হার মানিয়েছে।
চন্দ্রগঞ্জ থানা ভবন বাস্তবায়ন কমিটির সাধারণ সম্পাদক কাজি মো. মোস্তফা ফজল মাস্টার  জানান, দীর্ঘদিন ধরে সন্ত্রাসকবলিত এলাকা হিসেবে পরিচিতি লাভ করে চন্দ্রগঞ্জ। এখানকার সাধারণ মানুষসহ ব্যবসায়ী ও প্রবাসীরা সন্ত্রাসী জিসান ও নাছির বাহিনীর হাতে জিম্মি হয়ে পড়ে। প্রকাশ্যে মুখ না খুললেও অতিষ্ঠ মানুষ নীরবে সংগঠিত হয়ে দাবি তোলেন চন্দ্রগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রকে থানায় উন্নীত করার। সন্ত্রাসীদের গ্রেফতার, অস্ত্র উদ্ধারসহ জনগণের জান-মালের নিরাপত্তার বিষয়টি একসময় সাধারণ মানুষের দাবিতে পরিণত হলে সরকার ২০১৪ সালের ২ জুলাই একনেক বৈঠকে চন্দ্রগঞ্জ পুলিশ তদন্ত কেন্দ্রকে থানায় রূপান্তরের অনুমোদন দেয়।
চন্দ্রগঞ্জ থানা ভবন বাস্তবায়ন কমিটির সভাপতি মাওলানা আবদুল কুদ্দুস জানান, একনেক বৈঠকে অনুমোদনের পর সরকারি বরাদ্দের জন্য তাকিয়ে থাকেনি এই এলাকার শান্তিকামী মানুষ। কোমর বেঁধে নিজ উদ্যোগে তারা নেমে পড়ে থানা ভবন নির্মাণে। স্বেচ্ছায় কেউ অর্থ, কেউ ইট, বালু, রড আবার কেউ অন্যান্য নির্মাণসামগ্রী নিয়ে এগিয়ে আসেন। যাদের পক্ষে অর্থ বা নির্মাণ উপকরণ দেওয়া সম্ভব হয়নি তারা স্বেচ্ছায় কায়িক শ্রম দিয়েছেন। এভাবে ১১ মাসে ৪০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত হয় চন্দ্রগঞ্জ থানা ভবন। নবনির্মিত এই থানা এখন এ অঞ্চলের মানুষের আশা-ভরসার স্থান। এ কাজে সাধারণ মানুষকে উৎসাহিত করা এবং নেতৃত্ব দিয়েছেন তৎকালীন পুলিশ সুপার শাহ মিজান সাফিউর রহমান ও বর্তমান সহকারী পুলিশ সুপার (সার্কেল) মো. নাসিম মিয়া।
শুধু থানা ভবন নির্মাণের পরিকল্পনাতে সীমাবদ্ধ ছিলো না সাধারণ মানুষ। সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে মসজিদ, মাদ্রাসা, হাট-বাজারসহ প্রত্যন্ত এলাকায় প্রচার চালায় তারা। সন্ত্রাসীদের ধরিয়ে দিতে পুলিশকে সহযোগিতা করেছে সাধারণ মানুষ। মানুষের সহযোগিতায় পুলিশ চিহ্নিত ১৮ সন্ত্রাসী বাহিনীর মধ্যে বেশ কয়েকজন বাহিনীপ্রধানকে আটক করে। বিভিন্ন সময় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে এসব সন্ত্রাসী বাহিনী প্রধানদের বন্দুকযুদ্ধ হয়েছে। এতে বাহিনীপ্রধান দত্তপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান নূর হোসেন শামীম, চন্দ্রগঞ্জের জিসান, নাছির উদ্দিন, রতনেরখিলের আসাদুজ্জামান বাবুল, উত্তর জয়পুরের মোসলেহ উদ্দিন মুন্না, কুশাখালীর সোলায়মান, চরশাহীর দিদারসহ ১২টি বাহিনীর প্রধান অভ্যন্তরীণ কোন্দলে নিজ বাহিনীর সদস্যদের গুলিতে, কখনও পুলিশ বা র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে।
স্থানীয় সোনালী ইটভাটার মালিক ও কমিউনিটি পুলিশের সদস্য ফারুক হোসেন জানান, চন্দ্রগঞ্জ থানা ভবন নির্মাণের জন্য তিনি ২৪ হাজার ইট দিয়ে সহায়তা করেন। একইভাবে এলাকার ফাতেমা ইটভাটার মালিক দিয়েছেন ২০ হাজার ইট, শাপলা ইটভাটার মালিক দিয়েছেন ৬ হাজার ও মামণি ইটভাটার মালিক দিয়েছেন ৪ হাজার ইট। স্থানীয় জসিম মিয়া ৫০ হাজার, প্রবাসী মানিক মিয়া ৫০ হাজার, ব্যবসায়ী সেলিম মিয়া ২০ হাজার টাকার নির্মাণসামগ্রী দিয়েছেন। আবু সাঈদ দিয়েছেন ১০০ ব্যাগ সিমেন্ট। স্থানীয় নির্মাণ শ্রমিক মানিক মিয়া ও নুরুল আমিনসহ এলাকার অর্ধশত লোক স্বেচ্ছায় দিয়েছেন কায়িক শ্রম।
স্থানীয় প্রতাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সিরাজুল ইসলাম জানান, সন্ত্রাসীদের কর্মকান্ডের কথা মনে পড়লে যেমন বিব্রত ও লজ্জিত হতে হয়, তেমনি এখনও ভয়ে শিহরণ ওঠে শরীরে। তখনকার সন্ত্রাসী বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পায়নি এ বিদ্যালয়ের নিরীহ ছাত্রছাত্রীরাও। এখানে থানা প্রতিষ্ঠিত হওয়ায় বর্তমানে অনেকটা শান্ত রয়েছে একসময়ের অশান্ত ও সন্ত্রাসের এই জনপদ।
চন্দ্রগঞ্জ থানার ওসি একেএম আজিজুর রহমান মিয়া বলেন, এ অঞ্চলে যাতে সন্ত্রাসীরা আর মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারে সেজন্য নিরলসভাবে কাজ করছে পুলিশ প্রশাসন। তবে এজন্য বিভিন্ন রাজনীতিক দল, ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের সহযোগিতার কথাও স্মরণ করেন তিনি।
লক্ষ্মীপুর জেলার ভারপ্রাপ্ত পুলিশ সুপার মো. শরিফুল ইসলাম জানান, ইতোমধ্যে চন্দ্রগঞ্জসহ আশপাশের এলাকায় সন্ত্রাসীদের দৌরাত্ম্যের বিরুদ্ধে পুলিশের পাশে থেকে জনগণ যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে, তা দীর্ঘদিন মানুষ মনে রাখবে।