ড্রিম পার্ক : রুদ্ধ হবে সাধারণের বিচরণ !
-সুমন ভৌমিক-
এ শহরে যে ক’জন মুক্তমনা পাগল রয়েছে বা আছি, আমরাও এ শহরের নাগরিক। এ শহরে যা আছে সবইতো আপনাদের। আমাদের জন্য অবশিষ্ট কিছুই থাকবে না? আপনাদের উচ্ছিষ্টটুকুও না? ঠিক আছে আপনাদের যা খুশি করেন। যেহেতু আমাদের মুখে পাটের বস্তা ঠেঁসে দেয়া হয়েছে, তাই আমাদের মুখও বন্ধ! তবে ভুলে গেলে চলবে না, সমস্ত ভালোর সাথে আমাদের কিংবা আমাদের অগ্রজদের মতো কিছু লোকের অস্তিত্ব লেপটে আছে। আবার কিছু তথাকথিত মুখোশধারী কর্তাদের নষ্টামির বিপরীতে প্রতিবাদের ঝান্ডা ছুঁড়ে দেয়াদের দলেও আমরা ও আমাদের অগ্রজদের হাতের ছোঁয়া ছিল। এটা ভুলে গেলে চলবে না যে, এ যাবত জয় মুক্তমনা পাগলদেরই হয়েছে।  
আসল কথায় আসা যাক। নোয়াখালীর নতুন জেলা শহর তথা মাইজদীর জন্ম বৃটিশ আমলে। তৎকালীন সময়ের গুণিজনরা এ শহরের জন্য যা করে গেছেন, তারপর আপনারা তথাকথিত কর্তারা কী করেছেন? বুকে হাত রেখে আপনাদের চোখ দুটি বন্ধ করে একটু ভাবুন। হ্যাঁ, এ শহরের উন্নতি হয়েছে- কিছু বহুতল রঙিন বিল্ডিং হয়েছে আর আনাগোনা বেড়েছে যান্ত্রিক যানের। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে এক সময় হয়তো এ শহর মৃত্যুবরণ করবে। ভেবে দেখুন, শহরটিকে সেই মৃত্যুর কোলে ঠেলে দেয়া হচ্ছে না? একটি উন্মুক্ত স্থান খুঁজে দেন, যেখানে শহর কর্তারা মুক্তমনা পাগলগুলোর বিচরণ স্থানের বিস্তৃতি করেছেন! না পারবেন না। এ শহরের শিশুরা কী পাচ্ছে? কী দিয়েছেন কবি, লেখক, সাংবাদিক ও সাহিত্যিকদের জন্য। শীতল পরিবেশকে দিন দিন উষ্ণ করে তুলছেন, পরিবেশকে দুষিত করা হচ্ছে।  
একটি পাবলিক লাইব্রেরি আছে ঠিকই, কিন্তু পাবলিক লাইব্রেরিটি এখন কার্যত মৃত্যু পথযাত্রী। ‘টাউন হল’ সেখানে কারা বসছে ? ‘শহীদ মিনার প্রাঙ্গণ’ দিনের বেলায় যা তা, সন্ধ্যার পরে সেখানে কাদের আড্ডা- বখাটে, মদ্যপ ও পতিতাদের। শিল্পকলায় কারা বসেন? এ শহরে বেশ কয়েকটি বড় দীঘি ছিল। যেগুলো টাকার দাপটে প্রভাবশালীদের পায়ের বালুতে ঢেকে গেছে। সেখানে নির্মিত হচ্ছে বহুতল ভবন। শুধু একটি দীঘি রয়েছে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে। এ দীঘির চারপাশকে উন্মুক্ত তথা উদ্যান করার জন্য এ শহরের সংস্কৃতিমনা, সুশীল নাগরিক ও সাংবাদিকরা নানা ধরনের আন্দোলন করেছেন। অবশেষে হয়েছে, হ্যাঁ তবুও হয়েছে। আমরা ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আপনারা যারা অনেক দেরিতে হলেও কিছুটা করেছেন। আপনার শুভ বুদ্ধির উদয় হওয়াতে আমাদের আশার সূর্য কিছুটা হলেও উঁকি দিয়েছে মাত্র। আমাদের প্রত্যাশার সূর্যটা সবে আলো ছড়াচ্ছে...
ভাবলাম; শহীদ মিনারের অযত্ন ও রাতের অশ্লীলতাকে নিয়ে অনেক লেখালেখি, সুশীল নাগরিকদের অনেক বলাবলি- এর হয়তো কিছু একটা হবে। এখানে অন্তত প্রতি বছর বিজয় মেলা, একুশে বই মেলা, বৈশাখী মিলন মেলা, বিভিন্ন সময় গণমানুষের নানা দাবীর আন্দোলন এবং ফাগুন বেলায় নানা বয়সের মানুষের মিলন মেলা হয়। এসব মাথায় রেখে আমাদের পৌরপিতা, মাননীয় সাংসদ, জেলা প্রশাসক তথা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নানা আয়োজনে অন্তত বিআরডিবির পশ্চিম থেকে ‘কচি কাঁচার মেলা’র পশ্চিম-উত্তরটা আরো সাজিয়ে দেবেন। মাননীয় সাংসদ বিজয়মঞ্চে দাঁড়িয়ে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন কচি কাঁচার মেলার ভবনটি স্থানান্তর করে পশ্চিমে নিয়ে পুরো স্থানটি উন্মুক্ত উদ্যানে পরিণত করে দিবেন। প্রত্যাশা ছিলো সেই উদ্যানে বসার আসন, নতুন গাছ-গাছালি এবং নিরাপত্তার স্বার্থে কিছু একটা করবেন।
কিন্তু ১৪’র ডিসেম্বরের মাঝামাঝি, হঠাৎ বিআরডিবির পশ্চিম দিক থেকে শহীদ স্মৃতি ফলক ঘেঁসে দেয়াল উঠছে। ইতোমধ্যে নামফলক স্থাপনও হয়েছে। নিশ্চই আমাদের স্বপ্ন পূরণ হতে যাচ্ছে। অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বিজয় মাসের শেষ সপ্তাহ। ততক্ষণে নির্মিত দেয়াল আকাশ ছুঁই ছুঁই। অবাক হলাম আমরা। কৌতুহল জাগলো আমাদের মাঝে। কী হচ্ছে? আনন্দ নিকেতন নাকি জেলখানা?
নামগুলো না হয় বললাম না। তবে কয়েকজন সাংবাদিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব, আইনজীবী, প্রগতিশীল আন্দোলনের নেতৃবৃন্দ এক কথায় মুক্তমনা মানুষগুলো ছুটতে শুরু করলেন কয়েকজন কর্তার কাছে। জিজ্ঞাসায় বস্তু মিলল। আমরা নিশ্চিত হলাম- মুক্তমনাদের বিচরণ স্থল কোণঠাসা করার আয়োজন চুড়ান্ত। নোয়াখালী পৌরসভা গণপূর্ত বিভাগের এ জায়গাটা একটি বেসরকারি কোম্পানীকে পার্ক নির্মাণের জন্য দিলেন। কারা কাজ পেয়েছেন?  ‘আলিফ ডেভলপার প্রপাটিজ লি.’ সাম্প্রদায়িক একটি শক্তি। আরো নিশ্চিত হতে থাকলাম তাঁদের মূল উদ্যোশ্য কী?
এ শহরে প্রগতিশীল মানুষগুলোকে বসতে দেয়া হবে না। তাদের চিৎকার করার উন্মুক্ত স্থানকে প্রভাবশালীদের ব্যবসায় কেন্দ্রে পরিণত করা হবে। বড় মাপের পকেটওয়ালাদের ঝুলে থাকা পকেট ভারির স্থান করা হবে। এ শহরের অতীত ও ঐতিহাসিক অস্তিত্বকে নিশ্চিহ্ন করা হবে। হয়তো আগামী এক সময় রঙিন টাকার মোড়কে দিশেহারা এসব প্রভাবশালী এবং তাদের সাম্প্রদায়িক চিন্তক বন্ধুজনরা শহীদ মিনার, শহীদ মুক্তিযোদ্ধা স্মৃতিফলকটি কোণঠাসা করবে। এমনওতো বলতে পারে ‘আমরা কর্তৃপক্ষ থেকে পুরো জায়গাটা লিজ নিয়েছি, এসব এখানে থাকতে নেই’। ভেবে দেখুন। কথাগুলো সত্যি হতে পারে কিনা?
“দেয়াল তুলে উন্মুক্ত স্থানকে জেলখানার দেয়ালে ঘিরে ‘ড্রীম পার্ক’ নির্মাণ” গত বছর আমরা এসব ভেবে প্রতিবাদ করেছি। সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আদালতে মামলা করেছে আমাদের স্বজন-বন্ধুরা। সংবাদ ও নাগরিকদের চাপে পড়ে ভবিষ্যতে নিজেদের পিঠ বাঁচাতে মামলা করেছে গণপূর্ত বিভাগও। বিজ্ঞ আদালতের নির্দেশে প্রায় এক বছর বন্ধ থাকে ‘ড্রীম পার্ক’ নির্মাণ কাজ। তখন বিষয়টি অনুধাবন করতে পেরে মাননীয় সংসদ সদস্য একরামুল করিম চৌধুরীও কাজ বন্ধ রাখতে নির্দেশ দেন।
দুর্ভাগ্য;  এবার বিজয় চিহ্ন তাদের হাতে। চলতি বছরের ‘একুশের মাসে’ পুনঃ ‘ড্রিম পার্ক’ নির্মাণ কাজ চলছে। যারা প্রগতিশীল মানুষদের শাসিয়েছে, রক্তচক্ষু দেখিয়েছে, তারাই এ কাজের তদারকি করছে। এ শহরের মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের দাবীদার রাজনীতিকরা তাঁদের চেনা-জানাও। তারপরও কেন? এসবের উত্তর একটাই বাণিজ্যে ঝলসানো মুনাফায় সাধারণের অধিকার কিংবা চাওয়ার পাওয়ার দাম থাকতে নেই।  
তাহলে রুদ্ধ হবে সাধারণের বিচরণ ? আমরা কি এবার হেরে যেতে বসেছি?  বাতাসে শুধুই কি কষ্টের নিশ্বাস ছেড়ে বসে থাকবো? না। কিছু মানুষের মধ্যে এখন এই প্রশ্নগুলো ঘুরপাক খায়। এসবের মধ্যেও ঐক্যবদ্ধ হবার সুদৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে এগুতে চাই। আমরা শহরের উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয়, প্রতিপক্ষও না। শুধু বলতে চাই- অন্তত শহরের এ জায়গাটুকু বাণিজ্য কেন্দ্র করবেন না। আমাদের আবেদন, অনুরোধ, বিনয়, আকুতি- যারা এ শহরকে শাসন সংরক্ষণ করছেন, তাঁদের কাছে। আপনারা ভুলে যাবেন না- যখনই বিজয় মেলা, একুশে মেলা, বৈশাখী মেলা হয় তখনই এ পুরো জায়গাটা জুড়ে মানুষের মিলন মেলা হয়। এ শহরে আর কোনো উন্মুক্ত স্থান নেই। অন্তত এ টুকরোটুকু আমাদের পাগলমনা মানুষগুলোর জন্য বরাদ্দ করুন। দীঘির দক্ষিণ পাড়টি আরও একটু উঁচু করে, পাড় ঘেঁষে কিছু বসার আসন, নতুন কিছু গাছ-গাছালি আর সড়কের পাশ ঘেঁষে উত্তর-পশ্চিম পাড়ের মতো করে দিন। আমরা কৃতজ্ঞ থাকবো। এখানে বাণিজ্য করবো না, শুধু সময়ে সময়ে মিলবো আমরা । আমন্ত্রন থাকলো আপনাদেরও। শুধু সাধারণ মানুষের এই বিচরণস্থলটি মুনাফার বৃত্তে জড়াবেন না দয়া করে...
লেখক: সাংবাদিক, নোয়াখালী।
omrita07@gmail.com