বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্কয়ার : শুধু দিবসে নয় সম্মান প্রদর্শন হোক বছর জুড়ে
11
রুদ্র মাসুদ
মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ের ৪৫ বছর অতিক্রম করছি আমারা। অথচ; দিবসকে ঘিরে যেনো জেগে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা। সারাবছর কোন খবর থাকে না। বিগত চার বছর ধরে এমটিই ঘটছে বেগমগঞ্জের চৌরাস্তায় স্থাপিত চট্টগ্রাম বিভাগের একমাত্র বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন স্মরণে নির্মিত বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্কয়ারের ক্ষেত্রেও। রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন কিংবা ব্যক্তির পোস্টার আর ধুলোবালিতে ঢাকা থাকে স্কয়ার। কোন যত্ন কিংবা রক্ষণাবেক্ষণের বালাই নেই দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের।
ডিসেম্বর কিংবা মার্চ এলে পত্রিকায় লেখালেখি হয় এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচারণা পেলে পরিচ্ছন্নতায় নামে পৌরসভা। আবার ভুলে যায়, এবারও ব্যাত্যয় হয়নি এর। চলমান নোয়াখালীসহ বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে খবর প্রকাশিত হওয়া এবং ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় উঠলে চৌমুহনী পৌরকর্তৃপক্ষ পোস্টার সরিয়ে পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করে। তাই মুক্তিযোদ্ধা, শহীদদের পরিবার এবং সাধারণ মানুষের পক্ষের দাবি- শুধু দিবসকে ঘিরে নয়, বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনকে সম্মান প্রদর্শন করা হোক বছর জুড়ে। পাশাপাশি দৃষ্টিনন্দন ফোয়ারাটি চালুর মাধ্যমে চৌরাস্তার শোভাবর্ধনও করার দাবি উঠেছে।
এনিয়ে পৌর কতৃপক্ষের স্কয়ারটি রক্ষণাবেক্ষ ও পরিচ্ছন্ন রাখবে। তবে; যারা পোস্টার লাগায় তাদেরও সচেতন হওয়া জরুরী।
নোয়াখালী সড়ক বিভাগ, মুক্তিযোদ্ধা, শহীদ পরিবার ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, বেগমগঞ্জ উপজেলার সাবেক নির্বাহী কর্মকর্তা বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় চট্টগ্রাম বিভাগের একমাত্র বীরশ্রেষ্ঠ বেগমগঞ্জের কৃতিসন্তান বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্মৃতি স্তম্ভ স্থাপন করেন ২০০১ সালে। পরবর্তীতে ড. মাহবুবুর রহমানে যোগাযোগ মন্ত্রনালয়ের সচিব থাকার সময় তিনি বর্ধিত পরিসরে এবং দৃষ্টিনন্দন নকশার মাধ্যমে চৌরাস্তায় বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্কয়ার স্থাপনের পদক্ষেপ নেন। ২০০৮ সালের ১০ নভেম্বর এই স্কয়ারের ভিত্তি প্রস্তর স্থাপন করা হয়। বীরশ্রেষ্ঠের মূরাল স্থাপন, মুক্তিযোদ্ধার হাতে রাইফেল প্রতিস্থাপন,ফোয়ারা নির্মাণ, বক স্থাপন, বিভিন্ন পর্যায়ে এর নির্মাণ কাজের ব্যায় হয় ৫৫ লাখ টাকা। বীরশ্রেষ্ঠের পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতিতে ২০১২ সালের ২০ এপ্রিল বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্কয়ারের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। পরবর্তীতে এটি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য চৌমুহনী পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করে সড়ক ও জনপথ বিভাগ।
জমকালো উদ্বোধনের পর কিছুদিন ফোয়ারাটি চালু থাকলেও পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে শোভাবর্ধন উপকরণগুলো খুলে পৌরসভায় নিয়ে রাখা হয়। ধুলো ময়লার সাথে যোগ হয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের পোস্টার ও পেস্টুন। সারাবছর পোস্টার আর পেস্টুনে ঢাকা থাকে বীরশ্রেষ্ঠের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে নির্মিত স্কয়ারটি। বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালনের সময় পরিস্কার পরিচ্ছন্ন করা হলেও গত চার বছর ধরে শোভাবর্ধন উপকরণগুলো বসানো হয়নি। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় উদ্বুদ্ধ হয়ে নির্মিত স্কয়ারটি যেনো অসম্মানের সর্বোচ্ছ পর্যায়ে গিয়ে ঠেকে।
এদিকে বকগুলো বসিয়ে ফোয়ারাটি চালু রাখলে একদিকে যেমন পরিস্কার থাকতে অপরদিকে সুষ্ঠু তদারকিও থাকতে বলে মনে করেন মুক্তিযোদ্ধাদের অনেকেই। তাঁদের মতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন আন্তরিক হলে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্কয়ারের সম্মান প্রদর্শন যেমন হবে তেমনি এটি দশর্ণীয় স্থানও হতে পারতো।
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিনের নাতি এবং বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্মৃতি যাদুঘর ও গ্রন্থাগারের সদস্য সচিব সোহেল চৌধুরী বলেন- চৌরাস্তায় প্রশাসনের নাকের ডগায় এভাবে একজন বীরশ্রেষ্ঠের প্রতি অসম্মান সত্যি দু:খজনক। পরিবারের সদস্য হিসাবে নয় একজন সাধারণ নাগরিক হিসাবেও এটি কখনো কাম্য হতে পারে না। প্রতিবছর বীরশ্রেষ্ঠের মৃতুবার্ষিকীতে স্কয়ারের সম্মান রক্ষার দাবি তুলি আমরা, প্রশাসন কথা দেয় যথাযথ সম্মান রক্ষা করা হবে। কিন্তু ক’দিন পরই সবাই বেমালুম ভুলে যায়। আবার শুরু হয় অসম্মান, অপমান। এসব দেখার যেনো কেউ থাকে না।
বেগমগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার ক্ষোভের সাথে বলেন- এটি দেখবে কে? এর দায় এড়াবো কিভাবে আমরা। প্রশাসনের সাথে কথা হলে কিংবা সভা হলে উপস্থাপন করি আশ^াস পাই কিন্তু কাজ হয় না। সচেতন মানুষগুলোই অসম্মান করে বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্কয়ারের। বকগুলো বসিয়ে ফোয়ারা চালু করার দাবিও জানান তিনি।
তিনি জানান- বেগমগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন এটি রক্ষণাবেক্ষণের পদক্ষেপ নিবে বলে তাঁকে জানিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা। তবে; এটি বর্তমানে দেখভাল করছে চৌমুহনী পৌরসভা। উপজেলা এবং পৌরসভা প্রশাসন যৌথ পদক্ষেপ নিয়েও সারাবছর বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের বিষয়টি অব্যাহত রাখতে পারে। মুক্তিযোদ্ধারাও চায় শুধু দিবসে নয় সরাবছর যেনো এই বীর সন্তানের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করা হয়।
এ বিষয়ে চৌমুহনী পৌরসভার সচিব কাইয়ুম উদ্দিন চলমান নোয়াখালীকে বলেন, ইতোমধ্যে স্কয়ার থেকে ব্যানার-পোস্টারগুলো সরিয়ে নেয়া হয়েছে এবং স্টীলের সাইবোর্ড করা হচ্ছে যেন এখানে কেউ ব্যানার-পোস্টার না লাগানো হয়। একই সাথে রঙ করারও প্রক্রীয়া চলছে। তবে পানির লাইন না থাকার কারণে ফোয়ারাগুলো চালু করা সম্ভব হচ্ছে না বলে জানান তিনি।
এক প্রশ্নে তিনি বলেন, আগামী দিনে রুহুল আমিন স্কয়ারকে পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন ও শহীদের সম্মান অক্ষুন্ন রাখতে পৌরকর্তৃপক্ষ সকল ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
প্রসঙ্গত ঃ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য যে ৭জন বীর শ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন তাদের অন্যতম হচ্ছেন এক সময়ের বেগমগঞ্জ উপজেলা বর্তমানে সোনাইমুড়ী উপজেলা দেউটি ইউনিয়নের বাগপাঁচরা গ্রামের রুহুল আমিন। ১৯৩৪ সালে বাগপাঁচরা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন রুহুল আমিন। ৩ভাই ও ৪ ভাই নিয়ে ছিলো তাদের সংসার। শিক্ষা জীবন শুরু করেন বাগপাঁচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তার পর ভর্তি হন আমিশাপাড়া কৃষক উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৫১ সালে নৌ-বাহিনীতে নায়েক হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন। মুক্তিযুদ্ধে ২নম্বর সেক্টরে যুদ্ধরত রুহুল আমিন ছিলেন নৌ-বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘পলাশ’র প্রধান ইঞ্জিনরুমের আর্টিফিসার। বাঙালীর চুড়ান্ত বিজয়ের মাত্র ছয় দিনপূর্বে খুলনার রূপসা নদীতে যুদ্ধজাহাজ পলাশে দায়িত্বরত অবস্থায় পাকিস্তান বিমানবাহিনীর নিক্সিপ্ত গোলায় এ বীর শাহাদৎ বরণ করেন।
কর্মসূচী/অনুষ্ঠান ও প্রবাসের খবর