লোনা জলে টইটম্বুর চৌবাচ্চা
::রুদ্র মাসুদ ::
ত্রিশ এপ্রিল, চৌদ্দ পেরিয়ে পনের বছরে পা রাখবে। একমুঠো উচ্ছ্বাস, বাড়তি চাপ, কৈফিয়ৎ দেওয়ার জন্য প্রস্তুতি, হিসাব মেলানোর আয়োজন, সমালোচনা হজম করার পথ রপ্ত করা, পেছনের ভুল-11ত্রুটিগুলো শোধরানোর মানসিকতায় শান দেয়া, অভিনন্দিত হবার বাসনা সর্বপরি দেড় দশকের চৌকাঠ পেরোনোর দায়িত্বশীলতা তো আছেই। আর এসব দৃশ্যমান হবে বিশেষ প্রকাশনায়। আর তাই এবার যথাসময়েই উদ্যোগ নিতে পেরেছিলাম। এই দেড় দশকের পথচলায় চলমান নোয়াখালী নানা বিষয় তুলে এনেছে পত্রিকার পাতায়। তবে; যাদের নানামাত্রিক অংশগ্রহণে পাঠকপ্রিয়তা চলমান নোয়াখালীর সাথে তাদের যুক্ততার বিষয়টি কখনো আলোচনার বিষয় হয়ে ওঠেনি। তাই এবার সেইসব সহযোদ্ধাদের অনুভূতি জানতে প্রকাশনা বার্ষিকী সংখ্যার নাম দিয়েছি ‘সতীর্থ’। আর সেইসব সতীর্থদের কাছেই লেখা আহবান করা হয় যথাসময়ে।
নানা ব্যস্ততা কিংবা টানাপোড়েনের ভেতরে অনেকেই সময়মতো লেখা দিলেও আমরা তা প্রকাশ করতে পারিনি। শুধুমাত্র সময়ের নিক্তিতে বিচার করলেও বোধহয় ঠিক হবে না, কারণ প্রতিটি লেখা আপ্লুত করেছে। আনিসুর রসুল, জামাল হোসেন বিষাদ, নুরুল আলম মাসুদ, জাহিদুর রহমান, মীরন মহিউদ্দিন, মাহমুদুল হক ফয়েজ এবং হাবিব ইমনের লেখাগুলোতে চিত্রিত হয়েছে চলমান নোয়াখালীর সাথে আত্মিক সম্পর্কের মাত্রা। ইমেইল কিংবা ম্যাসেঞ্জারে প্রাপ্ত লেখাগুলো অশ্রু ঝরিয়েছে।
চলমান নোয়াখালীর সাথে কোনো ধরণের আনুষ্ঠানিক যুক্ততা না থাকলেও সার্বক্ষণিকভাবে সহযোগিতার হাত প্রসারিত রেখেছিলেন বন্ধু বিষাদ ভাই। প্র“ফ দেখা, পেস্টিং, সংবাদ বিন্যাস কিংবা ছাপার কাজে যখনই ডেকেছি সাড়া দিয়েছেন নি:শঙ্ক চিত্তে। সৃজনশীল যে কোনো বিষয় বিন্যাস, থিমগুলোকে কাব্যের রঙে রাঙ্গিয়েছেন। সবচে বেশী জ্বালাতন করেছি আমরা স্তুতি সমৃদ্ধ বাণী অথবা বিজ্ঞাপন তৈরিতে। চরম অনীহা এবং নীতিবিরুদ্ধ হওয়া সত্বেও তিনি একাজটি করে দিয়েছেন অসংখ্যবার। সবচে বড় সত্য হচ্ছে বিষাদ ভাই তাঁর নিজের পত্রিকারও এতোটুকু নিবিড় পরিচর্যা করার সময় পাননি, যেটুকু চলমান নোয়াখালীর জন্য করেছেন।
মীরন ভাই এবং ফয়েজ ভাইকে পেয়েছি আপাদমস্তক পরামর্শকের ভূমিকায়। লেখা, সংবাদ, ফিচার কিংবা গল্প-কবিতা দিয়ে প্রকাশনাকে এগিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি তীক্ষè সমালোচনা ছিলো ওনাদের কাছ থেকে। শিরোনাম তৈরি, সংবাদ বিন্যাস ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নিয়মিতই পরামর্শ এবং উৎসাহ দিয়েছেন। সময় সুযোগ মতো এখনো চলছে সেটি। সুদূর আমেরিকা থেকে চাপাচাপির পরও এতোটুকু বিরক্ত হননি তাঁরা। উপরন্তু কবে নাগাদ প্রকাশনা বের হবে সেই খোঁজ খবর রেখেছেন নিয়মিত।
নুরুল আলম মাসুদ সংবাদ কেন্দ্রিক সহযোগিতার চেয়ে চলমান নোয়াখালীকে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে দাঁড় করাতে নেপথ্য থেকে সবচে বেশী প্রণোদনা জুগিয়েছেন। শুধুমাত্র সংবাদ প্রকাশ নয় প্রকাশিত সংবাদকে নিয়ে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে দেনদরবারের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ত বিষয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণে বিভিন্ন সময়ে ছিলেন সচেষ্ট। পাশাপাশি পত্রিকার প্রকাশনাকে এগিয়ে নিতে তহবিল গঠনে যখন যেখানে যেতে অনুরোধ করেছি কখনো না করেননি।
চলমান নোয়াখালীর প্রতি হাবিব ইমনের আবদার অফুরন্ত। দুষ্টামি করে তাঁকে আমি ‘জেডা’ ডাকি এখনো। তাঁর সমসাময়িক অনেককে সংবাদ এবং লেখার জন্য অনুরোধ করতে হতো। অথচ; ইমন উল্টো লেখা কিংবা সংবাদের ঘাটতি আছে কিনা, সে দেবে কিনা জানতে চাইতো। এখনো কোন বিশেষ সংখ্যার জন্য লেখা না চাইলে অনুযোগ করেন।
আনিসুর রসূলের সাথে সম্পর্কটাও প্রায় একযুগ পেরিয়েছে। চলতে পথে হঠাৎ দেখার মতোই, এই একযুগে কোনো না কোনোভাবে পেয়েছি পথচলায়। চলমান নোয়াখালীর একজন নিবিষ্ট পাঠক হিসাবেই আমাদের সাথে হেঁটেছেন পায়ে পায়ে। লেখনী দিয়েও অংশ নিয়েছেন।
সুমন ভৌমিকের সাথে চলমান নোয়াখালীর পরিচয় শুরু থেকেই। তবে; আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে পড়া ২০১২ সাল থেকে। এর আগে একভাবে কোন ব্যক্তির শ্রম বিনিয়োগের ক্ষেত্রে যিনি অকৃপন তিনি হচ্ছেন সমকালের সহকারী সম্পাদক জাহিদুর রহমান। চলমান নোয়াখালীর কার্যালয়ে বসে টানা ২৪ ঘন্টা কাজ করার রেকর্ড আছে তাঁর। ফ্লপি ডিস্কে করে ম্যাটার নিয়ে ট্রেসিং বের করা, তারপর পেস্টিং, ছাপা হওয়ার পর পাঠকের দ্বারে দ্বারে তা আবার পৌছানো। বিজ্ঞাপন সংগ্রহ, আবার বিল জমা দিয়ে বিলের টাকা আদায় করা পর্যন্তই নয়; অফিসের যাবতীয় কাজও করেছেন নেহায়েত নিজের মতো করে। নোয়াখালী ছাড়ার আগে জাতীয় নিশানের বার্তা সম্পাদক পদে যখন কাজ করতেন তখনো অবসরে পড়ে থাকতেন চলমান নোয়াখালী নিয়ে।
সবশেষে পুরো চলমান নোয়াখালীর দায়িত্ব পড়ে সুমন ভৌমিকের ওপর। চলতি সময়ের বেশীরভাগ বিষয়ের সাথে আদর্শিক কারণে খাপ খাওয়াতে না পারা সত্বেও চেষ্টা করছেন অন্তত সম্পাদকীয় নীতিমালার প্রতি অবিচল থেকে বিগত সময়ের মতোই চলমান নোয়াখালীকে এগিয়ে নিতে। কঠিন এই যাত্রায় তাঁর সহযাত্রী দিদারুল আলম। তাদের জন্য শুভকামনা থাকবে।
যে মানুষগুলোর নাম উল্লেখ করলাম এ মানুষগুলো কখনোই এক কাপ চায়ের জন্য চলমান নোয়াখালীর সাথে যুক্ত হননি। এই মানুষগুলো চলমান নোয়াখালী কিংবা এর সম্পাদকের সাথে সম্পর্কের বিষয়গুলো বিবৃত করেছেন তাঁদের লেখনীতে। আর তাই তাঁদের সম্পর্কেও কিছুটা লিখতে হলো। আর ছোট্ট এই লেখাটি লিখতে আমাকে সময় নিতে হয়েছে দুই মাসেরও অধিক সময়। কারণ দেড় দশকে যাদের অংশগ্রহণে চলমান নোয়াখালী আজকের এই পর্যায়ে তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর ভাষা আমাদের নেই। প্রতিটি লেখা পড়ার সময় চোখ ভরে উঠেছে জলে। ছোট্ট চোখজোড়া বর্ষার জলে টইটম্বুর চৌবাচ্চার মতোই লোনা জলে টইটম্বুর।
এতো গেলো যারা লেখা দিয়েছেন তাঁদের কথা। এর বাইরেও রয়ে গেছেন সহ¯্র সুহৃদ। যাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, অফুরন্ত সময় কিংবা আর্থিক সহায়তা দিয়ে পাশে থাকা বিজ্ঞাপনদাতা শুভান্যুধ্যায়ীসহ সবার প্রতি আমরা কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি। চলমান নোয়াখালীর শুরুর দিকে যে দুইজন মানুষ পাশে থেকেছেন সাইফুল্যাহ কামরুল এবং মিজানুর রহমানের প্রতি কৃতজ্ঞতা। সর্বপ্রথম যে রাজনৈতিক নেতা তাঁর সর্বোচ্চ চেষ্টা দিয়ে চলমান নোয়াখালীকে এগিয়ে নিতে ঝুঁকি নিয়েছেন সেই ব্যারিস্টার এ এম মাহবুব উদ্দিন খোকন, নোয়াখালী জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক একরামুল করিম চৌধুরী এমপি, নোয়াখালী জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ডা. এ বি এম জাফর উল্যা, মামুনুর রশিদ কিরন এমপি এবং বেগমগঞ্জের আপামর জনগণের অকৃত্রিম বন্ধু মিনহাজ আহমেদ জাবেদসহ যেসকল রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ন্যুন্যতম সহযোগিতায় চলমান নোয়াখালী আজকের পর্যায়ে তাঁদের সবার প্রতি আমরা বিনম্র চিত্তে কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।
চলমান নোয়াখালী যদি একটি মালা হয় তাহলে প্রত্যেকেই সে মালার এক একটি ফুল। আমার চেষ্টার যে বৈতরণী তাতে সুখাশ্রিত স্মৃতি বিস্মৃতির অশ্রু গাথুনী মালা। সকলের ভালোবাসায় বিগত সময়ের মতো আগামির পথচলায় চাই অকুন্ঠ সমর্থন, সহযোগিতা এবং সহায়তা।

লেখক: প্রধান সম্পাদক-প্রকাশক, দৈনিক চলমান নোয়াখালী।