সাদাকালো লড়াই চলতেই থাকে !
::নুরুল আলম মাসুদ::

নোয়াখালীতে স্থানীয় পত্রিকা স্থায়ী হয় না। এখানে পত্রিকাকে পৃষ্টপোষকতা করার মত কোন ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নাই। এখানে পত্রিকাটিতে যোগান দেওয়ার মতো লেখক নাই, অংশদাতা নাই। এমন বহু কারণে স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত পত্রিকাগুলো শেষনাগাদ টিকতে পারে না। কিন্তু, টিকতে না পারার একশ একটি কারণ থাকার পরেও ইতোমধ্যে নোয়াখালী থেকে নিবন্ধিত পত্রিকার সংখ্যার ষাটটিরও বেশি; এবং নতুন আরো পত্রিকা প্রকাশের জন্য আবেদন নিবেদন চলছে। 11
পত্রিকা চলে মূলত: বিজ্ঞাপনের টাকায়। একটা সময় বেসরকারি বিজ্ঞাপনের বাজার চড়া ছিলো, কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের কাজ ও সেবার বহর বিস্তৃতির সাথে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে প্রায় প্রতিদিনই বিজ্ঞাপন জারি হয় এবং তা প্রকাশের জন্য পত্রিকাগুলোতে পাঠানো হয়। স্থানীয় কিছু কিছু পত্রিকা সেসব বিজ্ঞাপন পায়, আর বেশিরভাগই ডিএফপি তালিকাভূক্ত নয়-এমন অজুহাতের কারণে বিজ্ঞাপন প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়। তবে, বিজ্ঞাপন প্রদানকারী প্রায় সকল সরকারি প্রতিষ্ঠানে এবং তার বাইরে কিছু মানুষ থাকে যারা এ সকল বিজ্ঞাপনের গেইট কিপিং করেন এবং তারা কমিশনের জন্য ঢাকা থেকে প্রকাশিত বিভিন্ন অপরিচিত-ছিপাগলির পত্রিকায় এসব বিজ্ঞাপন পাঠায়।
তাহলে বাদ থাকে আর একটা উপায়, তাহল পত্রিকা বিক্রির টাকায় পত্রিকার যাবতীয় খরচ নির্বাহ করা। কিন্তু স্থানীয় একটি পত্রিকা বড়জোর ছাপাই হয় পাঁচশত কপি; সেটা সরকারি অফিসে বিলি করে এবং অন্যসব জায়গায়ও তা বিনামূল্যে প্রেরণ করা হয়। বেশকিছুদিন ধরে কয়েকটি পত্রিকাকে দেখছি তারা চেষ্টা করছেন পত্রিকাটি হকার দিয়ে বিক্রি করাতে; কিন্তু হকাররা সম্ভাব্য গ্রাহকের কাছে পত্রিকাটি বিক্রির জন্য এমন ভাবে আর্জি পাড়েন তখন মনে হয় তিনি পত্রিকা বেচা না বরং ভিক্ষা চাইছেন। ব্যাপক অনলাইন শাসনের মধ্যেও বাসাবাড়ি-অফিস-ভাসমান ক্রেতাদের একটা অংশ এখনো নিয়মিতভাবে পত্রিকা কেনেন; কিন্তু স্থানীয় পত্রিকা আসলে ক’জনে কিনে?
স্থানীয় পত্রিকা আসলে ক’জনে কিনে বা কিনে না কেন; এমন প্রশ্ন নিশ্চয়ই যারা পত্রিকা প্রকাশ করছেন তারা চিন্তা করেন। অথবা, বিজ্ঞাপন পাওয়া যায় না বা পত্রিকা বিক্রি হয় না তবু কেন পত্রিকাটি বের করতে চায় বা কেনই বা বের করছেন তারও কোন কারণ আছে। হতে পারে যে কারণে পত্রিকা বিক্রি হয় না সেই একই কারণে নতুন নতুন পত্রিকা প্রকাশিত হয়।
প্রায় বেশিরভাগ স্থানীয় পত্রিকার সম্পাদকরা ঢাকা থেকে প্রকাশিত কোন একটা পত্রিকার স্থানীয় প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করেন এবং তিনি এক সপ্তাহ ধরে যেসব সংবাদ ঢাকার পত্রিকায় প্রকাশ করেন সেগুলোর একটি হুবুহু সংস্করণ দিয়ে সপ্তাহে একটি পত্রিকা ছাপেন, ব্যাস! এছাড়া সরকারি অফিস থেকে বিজ্ঞাপন ভাগাতে জেলাপ্রশাসকের চোখে ঘুম নেই-রাতদিন কাজ করছেন পুলিশ সুপার ইত্যাকার সংবাদ সংকলন পড়ে পাবলিকের কি লাভ? সেই সাথে অমুক নেতা কল্লাকাটা ফটুতে জিন্দাবাদ-মারহাবা জাতীয় সংবাদ-বিজ্ঞাপন; সেখানেও বা পাবলিকের জন্য কনটেন্ট কী? ফলে যখন বলা হয় পত্রিকা বেচা-কেনার সাধারণ তরিকায় কোন পত্রিকায়ই চলে না, কিন্তু তবুও প্রতিদিন নতুন নতুন পত্রিকা বের হয় তখন বুঝতে হয় সাধারণ তরিকায় নয়- অসাধারণ (!) কোন তরিকায় পত্রিকা আরো ভালো চলে বলেই পত্রিকা বের হয়-সেখানে মানুষের খবরাদি মুখ্য নয়; সেখানে দলবাজি-দালালি-চোরাগুপ্তা কারবারই হয়তো মুখ্য।
এই রকম একটি অবস্থা থেকেই চলমান নোয়াখালীর প্রতি আমার মুগ্ধতার শুরু। পত্রিকাটির পরিচ্ছন্নতা-বিন্যাস-সংবাদ অন্য যেকোন স্থানীয় পত্রিকার চেয়ে আলাদাভাবে চোখে পড়তো। আমি চলমান নোয়াখালীর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে গিয়েছিলাম, যদিও আমি সেখানে আমন্ত্রিত ছিলাম বলে মনে পড়ে না। একটা স্থানীয় পত্রিকা প্রকাশিত হচ্ছে সেই আনন্দে আমি তখনকার কয়েকজন সহকর্মীর সাথে সেই অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলাম। কিন্তু, এই পত্রিকাটির সাথে খাতির শুরু হয় তারও বহু পরে। প্রায় প্রতিটি সংখ্যাতে চলমান নোয়াখালী একটি স্থানীয় সংবাদকে বিস্তারিতভাবে প্রকাশ করতো, সংবাদটি পড়লে বুঝা যেত প্রতিবেদন রচনাটির জন্য মাঠে গিয়েছেন- খেঁটেছেন।
একটা সময় আমার কাজের কারণে চলমান নোয়াখালী সম্পাদক রুদ্র ভাইয়ের সাথে যোগাযোগটা বাড়তে থাকে। আমি পুরানো চাকুরি ছেড়ে নতুনভাবে কাজ শুরু করি; শুরুরদিকের নানান ধরণের এক্টিভিজমের কাজ। রুদ্রভাইও যুক্ত ছিলেন আমাদের সাথে এবং তখন উনাকে নতুনভাবে আবিষ্কার করলাম; তিনি আসলে যতটা না সাংবাদিক-সম্পাদক, তার’চেও বড় তিনি আদ্যপ্রান্ত একজন এক্টিভিস্ট। ফলে তার আর আমার আচরণ অনেকেটাই গেল মিলে। সে সময় আমরা ‘যুবউদ্যোগ নোয়াখালী’ নামে একটা উদ্যোগ হাতে নিয়েছিলাম। জেলার অধিকতর উন্নয়ন-সুশাসন-জনঅংশগ্রহণ নিশ্চিত করার জন্য একটি জনআন্দোলন গড়ে তোলা। আমাদের পরিকল্পনা ছিলো মাঠে আন্দোলন গড়ে তোলা এবং তা প্রকাশের জন্য এবং একই সাথে তার খোরাক যোগানোর জন্য চলমান নোয়াখালীকে কাজে লাগানো। কিন্তু পরবর্তীতে সে কাজটা আমরা বেশিদূর এগিয়ে নিতে না পারলেও পত্রিকা নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করার চেষ্টা করেছিলাম।
আমরা চলমান নোয়াখালীর উপজেলা প্রতিনিধিদের নিয়ে আলোচনা-কর্মশালা করেছিলাম; কিছু প্রকাশনা নীতিমালা ঠিক করেছিলাম। প্রতি সংখ্যায় জেলার একটি হিডেন ইস্যুতে গভীরতর সংবাদ প্রকাশ এবং তা যেন অন্য সংবাদকর্মীদের সোর্স হিসেবে প্রকাশিত হয় এমন সংবাদ প্রকাশ করা, প্রতিটি সংবাদ প্রকাশের সাথে তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সাথে সমস্যা নিরসনে দেনদরবার করা, ধ্র“পদি সংবাদ প্রকাশের বাইরে সাধারণ মানুষের সংবাদ প্রকাশ করা, জাতীয়-আন্তজার্তিক মুমেন্টামগুলোর সাথে একাত্ম প্রকাশ এবং ভূমিকা রাখা ইত্যাদি বিষয়েও কাজ করেছিলাম। আসলে আমরা করেছিলাম বললে বাড়তি বলা হয়, সম্পাদক রুদ্র মাসুদ নিজেই এমনটার জন্য উদ্যোগী হয়েছিলেন বলেই আলোচনা হয়েছিলো। অন্য অনেকের মত আমিও সাথে ছিলাম। পরবর্তীতে রুদ্র ভাইয়ের মধ্যে এসব আলোচনার প্রভাব দেখেছিলাম।
আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের মাস কয়েকের মধ্যে কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী নোয়াখালী আসবেন। খবরটি রুদ্র ভাই আমাকে প্রথম দিয়েছিলেন। আমি তখন কৃষি বিষয়ে কাজকর্ম করি- কথাবার্তা বলি। আমি আর রুদ্র ভাই পরিকল্পনা করলাম, মতিয়া চৌধুরী যখন নোয়াখালী আসবেন তখন উনারা আসলে স্থানীয় কৃষির এজেন্ডা আমরা তুলে দিবো। সেবার আমি আর রুদ্র ভাই এক সপ্তাহ প্রায় প্রতিদিন গ্রাম-চরাঞ্চলে গিয়েছিলাম। ৩১ আগস্ট রাতে ছাপা হলো চলমান নোয়াখালী আর রুদ্র ভাই একই সংবাদের ছোট ভার্সন পাঠালেন দৈনিক সমকালে। পরদিন ১ আগন্ট ’০৯ ভোরবেলায় রুদ্র ভাইয়ের ফোন, কৈই সন্ধানির সামনে আসেন। সাহেবী সাজে দাঁড়িয়ে আছেন রুদ্র ভাই, হাতে ব্যাগে পত্রিকার কোণা বেরিয়ে আছেন। চলমান নোয়াখালী আর সমকালে একই সাথে ছাপা হয়েছে ‘পানির অভ্যাবে নোয়াখালীতে অনাবাদি থাকে দুই লাখ হেক্টর জমি’। এরপর জেলা প্রশাসকের অফিসে গিয়ে দেনদরকার, একটু পরে এখানে এসে পৌছাবেন কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, উনার সভার টেবিলে পত্রিকা দুটো দিতে হবে। অবশেষে, উনার টেবিলে পত্রিকা দুটো পৌছেছিলো, একদম মন্ত্রীর হাতে; এবং সেই সংবাদটিই নিয়ন্ত্রণ নিয়েছিলো সেই সভার আলোচ্য সূচির!
একই বছর দু’ হাজার নয় সালের মার্চ মাসে সিএসআরএল ও প্রান আবদুল্যাহ মিয়ার হাটে গ্রামীণ জীবনযাত্রার মেলার আয়োজন করেছিলো। সেবার আমরা দাবি তুলেছিলাম নোয়াখালীতে কোন বীজ ভান্ডার নেই, কোন বীজউদ্যান নেই। বীজ উদ্যান ও বীজ ভান্ডার না থাকার কারণে ফেনী, গাজীপুর, ময়মনসিংহ থেকে বীজ আনতে গিয়ে অনেক সময় বীজের গুণগত মান খারাপ হয়। সেখানে উপস্থিত সংসদ সদস্য নোয়াখালী বিএডিসি’র উপপরিচালককে এ বিষয়ে প্রস্তাবনা তৈরি করে তা মন্ত্রনালয় ও সাংসদ মহোদয়কে পাঠাতে নির্দেশনা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে রুদ্র মাসুদ এ বিষয়ে চলমান নোয়াখালীতে বহু সংবাদ ছেপেছিলো এবং বিজন দা, রুদ্র ভাই আর আমি প্রায়ই এই বিষয়ে দেনদারবার করতে বিএডিসি ও সাংসদ মহোদয়ের কাছে গিয়েছিলাম। আজ নোয়াখালীর দক্ষিণে সেই বীজ উদ্যান দৃশ্যমান।
রুদ্র ভাইকে আমি পেয়েছি রাস্তায় থাকা এক্টিভিস্ট হিসেবে, উনাকে জেনেছিলাম ভীষণ ইমোশনাল লড়াকু হিসেবে, পেয়েছিলাম সাহস-জাগানিয়া বন্ধু হিসেবে, জেনেছিলাম দারুন স্বপ্নবাজ হিসেবে। রুদ্র ভাই আর আমার যা গল্প তা বেশির ভাগই উনার কাছ থেকে পাওয়ার গল্প, হতে পারে সে পাওয়া স্নেহ-ভালোাবাসা-আগলেরাখা-সাহস যোগানোর মতো কিছু। তিনি মোটা দাগে একজন সামগ্রিক মানুষ। চলমান নোয়াখালীর সাথেও তিনি চাইতেন সেই সামগ্রিকতার প্রকাশ ঘটাতে। তিনি বহু সময়ে উনার বন্ধু-শুভানুধ্যায়ীদের তার পরিকল্পনা-কাজে যোগ করতেন। আমার মতো মাথামোটা- হাবুদ্ধির মানুষকেও তিনি বিভিন্ন সময়ে পত্রিকাটির পরিকল্পনা, সম্পদ আরোহণ, যোগাযোগ তৈরিতে সম্পৃক্ত করেছিলেন। আজ চলমান নোয়াখালী প্রকাশনা পনের বছরে সেই জন্য আমি গর্ববোধ করছি।
আজকাল আমরা সহায়তা, সম্পৃক্ততার প্রকাশটা এমনভাবে ঘটাই তাতে প্রধান অনুঘটকেই মৃত মনে হয়। সৌভাগ্যক্রমে আমার তেমন কোন সম্পৃক্ততা এই গল্পে ছিলো না।স্রেফ, সম্পাদক সুযোগ দিয়েছিলেন বলে আমি চলমান নোয়াখালীর সাথে কাজ করতে পেরেছি। আমি চলমান নোয়াখালী, সম্পাদক এবং পুরো পরিবারের প্রতি কৃতজ্ঞ।
কারো কোঠরির বাইরে থেকে, তৈলবাজি ছাড়া, ছাড়াগরুর মত যেভাবে চলমান নোয়াখালী চলে তাতে সত্যি এটিকে টিকিয়ে রাখা, চলার পথে মান ঠিক রাখা, জনমানুষের কথা তুলে আনা, বিগত সময়ের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা কঠিন। তবু বর্তমানে অলইনওয়ান ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক এটিকে নামের মতোই চলমান রেখেছেন। এটি তার কৃতিত্ব। তাকেও ধন্যবাদ।
রুদ্র ভাই এখানে নাই, উনার সবচেয়ে ভালোবাসার সৃষ্টিটি এখনো আছে। উনার অনুপস্থিতিতে বুঝতে পারছি উনার সামগ্রিকতার শক্তিটা কতবেশি জোরদার। চলমান নোয়াখালীর সাথে শুভানুধ্যায়ীদের অবিচল সম্পর্ক দেখে বুঝতে পারি এটি মানুষের কতটা ভালোবাসার যোগাযোগ।
চলমান নোয়াখালী চলতে থাকুক অসীম সময়ের সীমানায়। ঠিকানা হয়ে উঠুক সকল মেহনতি-বঞ্চিত-লড়াকু-প্রান্তিক মানুষের।
লেখক: নির্বাহী প্রধান, পার্টিসিপেটরি রিচার্স এ্যাকশন নেটওয়ার্ক-প্রান ও উন্নয়ন গবেষক।