হাতিয়ায় নৌকা ডুবিতে ৪ জেলের মৃত্যু
নিজস্ব প্রতিনিধি
হাতিয়া উপজেলার চানন্দি ইউনিয়নের জনতা বাজার ঘাট এলাকায় নৌকা ডুবিতে ৪ জেলের মৃত্যু হয়েছে। এ সময় জীবিত উদ্ধার হয়েছে আরো দুই জেলে। গত সোমবার দিবাগত রাত ১১টার দিকে জোয়ারের তীব্রতায় এ নৌকা ডুবির ঘটনা ঘটে। রাত দুইটার দিকে জেলে ও স্থানীয়দের সহযোগিতায় মরদেহগুলো উদ্ধার করা হয়।
নিহতরা হচ্ছেন, ওই ইউনিয়নের আদর্শ গ্রামের হেলাল উদ্দিনের ছেলে রাকিব (১৬), আবুল হোসেনের ছেলে রাশেদ (২৫), ভুট্টু মিয়ার ছেলে সম্পদ (১৪) ও নজরুল ইসলামের ছেলে কামরুল (১৮)। জীবিত উদ্ধার হওয়া জেলেদের মধ্যে একজনের নাম সম্পদ ও অপরজন মহি উদ্দিন।
ডুবে যাওয়া নৌকার মালিক এমরান মাঝি জানান, তাঁর নৌকায় মোট ৯ জেলে কাজ করে। সোমবার সন্ধ্যার দিকে নদী থেকে ইলিশ মাছ আহরণ শেষে জনতাবাজার ঘাটের আড়তে মাছ দেয় তারা। এর মধ্যে তিন জেলে বাড়িতে বিশ্রাম করতে যায়। অন্য ৬জন পুনরায় নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার প্রস্তুতি স্বরূপ নিত্য প্রয়োজনীয় খাদ্যদ্রব্যাদি ক্রয় করে নৌকায় চলে যায়। নৌকা তখনও নঙর অবস্থায় ছিল। রাত ২টার দিকে জোয়া অনুযায়ী পুনরায় নদীতে মাছ ধরতে যাওয়ার কথা ছিল তাদের। কিন্তু রাত ১১টার দিকে হঠাৎ নদীতে জোয়ারের তীব্রতা দেখা দেয়। এ সময় জোয়ারের তোড়ে নঙর ছিঁড়ে নৌকাটি উল্টে যায়।
তিনি আরো জানান, তাৎক্ষণিক ঘাটে ভীড়ে থাকা অন্য নৌকার মাঝি-মাল্লারা দ্রুত অন্য নৌকা দিয়ে উল্টে যাওয়া নৌকাটি ঘিরে ফেলে। ফলে জোয়ারে নৌকাটি ভেসে যাওয়া থেকে রক্ষা পায়। এ সময় স্থানীয় পুলিশ ফাঁড়ির সদস্য, ব্যবসায়ী, বাসিন্দা ও জেলেসহ অর্ধশত লোক নৌকা উল্টে নিখোঁজ হওয়া ৬ জেলেকে উদ্ধারে তৎপর হয়ে পড়ে। এর মধ্যে সম্পদ ও মহি উদ্দিনকে জীবিত উদ্ধার করা সক্ষম হয়। পরবর্তীতে উল্টে যাওয়া নৌকাটিকে অনেক চেষ্টার পর কূলে ভিড়ে আনা হলে নিচ থেকে নিখোঁজ চার জেলেকে উদ্ধার করা হলেও তারা কেউ জীবিত ছিল না।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছে চানন্দি ইউনিয়নের প্রশাসক আবদুর রহিমসহ স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ। তবে উপজেলা প্রশাসন বা জেলা প্রশাসনের কেউ কোনো খবর নেয়নি। বিকালে নিহত চারজন জেলের মরদেহ দাফন করা হয়েছে। দাফনকাজে আর্থিক সহযোগিতা করেছিলেন নৌকার মালিক এমরান মাঝি। এ ছাড়া এখনও পর্যন্ত সরকারি কোনো সহযোগিতা পায়নি তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নৌকা ডুবির ঘটনা এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে নিহত ও জীবিত উদ্ধার হওয়া জেলেদের পরিবার পরিজন ঘটনাস্থলে ছুঁটে আসে। সোমবার শেষ রাতে ঘটনাস্থলে এক হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়।
নিহত সম্পদের খালাত ভাই জনতা বাজার ঘাটের ব্যবসায়ী শাহেদ বলেন, তার খালাতো ভাইয়ের বয়স ১৩ থেকে ১৪ বছর। তাদের পরিবারে সদস্য নিহত সম্পদসহ ৭জন। এর মধ্যে তিন বোন ও দুই ভাই। সম্পদ ভাই-বোনের মধ্যে দ্বীতিয়। বড় বোনটির বিয়ে দিলেও ছোট আরো দুটি বোন রয়েছে পরিবারে। রয়েছে একটি ছোট ভাই। দক্ষিণ হাতিয়ায় ভাঙনের কবলে পড়ে কয়েক বছর পূর্বে এখানে খাস জমিতে বসতি স্থাপন করে। ৭ সদস্যের পরিবারে সে ও তার বাবাই কাজ করে। বাবা কৃষিকাজ করে, আর সম্পদ নদীতে মাছ শিকার করেই পরিবারের ভরণ-পোষন নির্বাহ করে। কিন্তু শিশু অবস্থায় সম্পদের এ মৃত্যু পরিবারের সদস্যরা মেনে নিতে পারছে না। সোমবার রাত থেকে মঙ্গলবার বিকাল পর্যন্ত কয়েক দফায় তার মা সন্তানের মৃত্যুতে মুর্ছা যাচ্ছিল। হতবাক হয়ে গেছে তার বাবা ভুট্টু মিয়া।
হাতিয়ার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবদুল মজিদ ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেন। তিনি বলেন, মঙ্গলবার সকালের দিকে উদ্ধার হওয়া জেলেদের মরদেহ তাঁদের স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। বিকালে মরদেহ পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
জানতে চাইলে হাতিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজাউল করিম বলেন, নৌকা ডুবিতে চার জেলে নিহত হওয়ার বিষয়টি জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা হয়েছে। জেলা প্রশাসন থেকে কোন সহযোগিতা আসলে নিহতদের পরিবারকে তা প্রদান করার আশ্বাস দেন তিনি।