যানবাহন তল্লাশি ও দোকানপাঠ বন্ধ : অনেকটা গৃহবন্দি নোবিপ্রবির শিক্ষার্থীরা
13
বিশেষ প্রতিনিধি
নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (নোবিপ্রবি) হলগুলোর ছাত্র ও ছাত্রীরা অনেকটা গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের দাবী ক্যাম্পাসের বাহিরের দোকানপাঠ বন্ধ রাখা ও শহরে যাতায়াতে স্থানীয়দের যানবাহন তল্লাশির হয়রানির কারণে এমন অবস্থা দেখা দিয়েছে। এতে তারা টিউশনি ও বাজার করতে যেতেও পারছে না। এতে না খেয়ে থাকার উপক্রম হচ্ছে। একই সঙ্গে নিরাপত্তাহীনতায়ও ভূগছে তারা। প্রাণহীন হয়ে পড়েছে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস।
মঙ্গলবার সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, পুরো ক্যাম্পাস থমথমে। বিশ্ববিদ্যালয় খোলা থাকলেও নেই ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাণচঞ্চলতা। শিক্ষার্থী বহনকারী গাড়িগুলো ক্যাম্পাসে লাইনে পড়ে রয়েছে। যেখানে খোলার সময় পুরো ক্যাম্পাস থাকতো উৎসবে ভরা। ক্যাম্পাসের বাহিরের দোকানগুলোতে ছাত্র-ছাত্রীদের ভীড়ে বাহিরের কেউ বসারও স্থান পেত না। সড়কের আশপাশে সহপাঠিদের আড্ডা থাকতো। গতকাল ছিল তার ব্যতিক্রম। ক্যাম্পাস ছিল প্রাণহীন। ক্যাম্পাসের বাহিরের দোকানপাঠ বন্ধ। দোকানপাঠ এলাকায় রয়েছে বিপুলপরিমাণ পুলিশের পাহারা। সোনাপুর-নোবিপ্রবি সড়কে ইজিবাইক ও অটোরিকশার আনাগোনাও কম। রাস্তায় দেখা মেলেনি শিক্ষার্থীদের। ফাঁকা ছিল সড়কটি। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগও ছিল অনেকটা ফাঁকা।
শিক্ষার্থীদের পরিবহনের একাধিক চালক বলেন, প্রতিদিন সকাল থেকে জেলা শহরসহ বিভিন্ন স্থান থেকে এক একটি গাড়ি ১০০ থেকে ২০০ পর্যন্ত শিক্ষার্থী নিয়ে ক্যাম্পাসে আসতো। সেখানে কোনো কোনো গাড়িতে ৫ থেকে সর্বোচ্চ ১০জন এসেছে। সোনাপুর থেকে ক্যাম্পাসের দিকে রওয়ানা হতে চালক ও শিক্ষার্থীরা ছিল আতংকে। তবে মঙ্গলবার সকাল থেকে কোনো প্রকার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটেনি।
ক্যাম্পাসের ছাত্রীহলের একাধিক ছাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রাস্তায় কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটলেও তাদের মধ্যে আতংক কাজ করছে। গত রোববার ও সোমবার বিভিন্ন স্থানে স্থানীয় লোকজন তাদের গাড়ি থেকে নামিয়ে দিয়েছে। শারীরিক ও মানসিকভাবে লাঞ্চিত করেছে। নানাভাবে হয়রানি ও ভয়ভীতি দেখিয়েছে। যার কারণে তারা বাহির হচ্ছে না।
শিক্ষার্থীরা জানান, গত রোববার তুষার ও রোমেলের নেতৃত্বে ৬-৭জন বহিরাগত ক্যাম্পাস থেকে দুই ছাত্রকে ডেকে নিয়ে মারধর করে। এ ঘটনার জের ধরে রোববার সন্ধ্যা থেকে রাত পর্যন্ত ছাত্র-স্থানীয়দের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। যানবাহন, দোকানপাঠ ও বিভিন্ন বাড়িতে হামলা-ভাংচুর হয়েছে। সোমবার সকাল থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা শান্ত থাকলেও স্থানীয় লোকজন সোমবার সকালেও এক ছাত্রকে মারধর করে। এছাড়া বহিরাগতরা সোনাপুর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত বিভিন্ন স্থানে বেরিকেড সৃষ্টি করে। তারা বিভিন্ন যানবাহনে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা রয়েছে কিনা তা তল্লাশি করতে শুরু করে। কোনো যানবাহনে শিক্ষার্থী ফেলে তাকে শারীরিকভাবে লাঞ্চিত করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, বাহিরে পুলিশ থাকলেও পুলিশের চোখ ফাঁকি দিয়ে বহিরাগতরা শিক্ষার্থীদের হয়রানি করছে। ক্যাম্পাসের বাহিরের সবগুলো দোকানপাঠ বন্ধ করে দিয়েছে। দোকানিদের স্থানীয়রা ভয়ভীতি দেখিয়ে দোকান বন্ধ রাখতে বাধ্য করেছে। ফলে হলগুলোতে থাকা ছাত্র-ছাত্রীরা নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে পারছে না। অনেককে নাস্তা না খেয়ে থাকতে হচ্ছে। বহিরাগতদের ভয়ে দুটি হলের কয়েকশত শিক্ষার্থী শহরেও যেতে পারছে না। তাদের টিউশনি, বাজার করা ও খাওয়াদাওয়ারে খুব সমস্যা হচ্ছে। ক্যাম্পাসের ভেতরের ক্যান্টিনে পর্যাপ্ত খাবার পাওয়া যাচ্ছে না। সব চেয়ে বেশি বেকায়দায় পড়েছে ছাত্রীরা। সব মিলিয়ে ক্যাম্পাসের ছাত্র-ছাত্রীরা অনেকটা গৃহবন্দি হয়ে পড়েছে। শিক্ষার্থীরা বলছে, এমন পরিস্থিতি তৈরির নেতৃত্ব দিচ্ছে স্থানীয় জাহাঙ্গীর মেম্বারের ছেলে রোমেল।
তবে অভিযুক্তের সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাঁকে পাওয়া যায়নি। দোকানপাঠ বন্ধ রাখার বিষয়ে এক ব্যবসায়ী জানান, রোববার রাতের ঘটনায় শিক্ষার্থীরা একাধিক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে। দোকানের সাটার ও বাহিরের অংশে কুপিয়েছে। আবার স্থানীয় কিছু লোকজনও দোকান বন্ধ রাখতে বলেছে। তাই দোকানিরা বাধ্য হয়ে দোকানপাঠ বন্ধ করে দেয়।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের একাধিক সূত্র জানায়, সোমবার থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, রেজিষ্ট্রার, শিক্ষক ও কর্মকর্তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের আশপাশের বিভিন্ন বাড়িতে বাড়িতে গিয়ে তাদের সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতির বিষয়ে কথা বলেছে। যা হয়েছে তা সকলের জন্য দু:খজনক বলেও এসেছে। বিশ্ববিদ্যালয়কে শান্তিপূর্ণ রাখতে স্থানীয়দের সহযোগিতাও কামনা করেছে। কিন্তু তারপরও কিছু ভয় শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিরাজ করায় অনেকটা থমথমে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন গতকাল মঙ্গলবার বৈঠকও করেছে বলে সূত্র জানায়।
থমথমে পরিস্থিতি, শিক্ষার্থীদের মাঝে আতংক ও দোকানপাঠ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীদের সমস্যার কথা স্বীকার করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টোর মুহাম্মদ মুসফিকুর রহমান। তিনি বলেন, শিক্ষার্থীদের ভয়-ভীতি পাওয়ার কোনো কারণ নেই, বর্তমানে পরিস্থিতি বেশ শান্ত রয়েছে। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। স্থানীয়দের মধ্যে এখন আর কোনো ক্ষোভ নেই। পরিস্থিতি অনেকটাই স্বাভাবিক রয়েছে। এ নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে আরো বৈঠক হবে বলেও জানান তিনি।
নিরাপত্তার বিষয়ে সুধারাম মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনোয়ার হোসেন বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। যেকোনো ধরণের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন রয়েছে। মঙ্গলবার সকাল থেকে কোথাও কোনো অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেনি। দোকানপাঠ বন্ধের বিষয়ে তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা কয়েকটি দোকানে হামলা চালানোর কারণে ব্যবসায়ীরা বন্ধ রেখেছে। তবে তা খুলে দেয়ার বিষয়ে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা করছে।
11
চলতি সংবাদ