সুযোগ পেলে তারাও হবে আলোকিত মানুষ
13
আব্দুল বারী বাবলু, সুবর্ণচর-
পথের ধূলা গায়ে জড়িয়ে, অন্যের ঠিকানায় ছাপড়া ঘরের মাটির বিছানায় অনিশ্চিত অন্ধকার মাথায় নিয়ে তাদের জন্ম। বাসস্থান, জীবন জীবিকা, সুশিক্ষা, স¦াস্থ্য’র মতো মৌলিক বিষয়গুলো ছাড়াই বেড়ে ওঠা। যে বয়সে বই-খাতা নিয়ে স্কুলে ছুটার কথা সেই বয়সে বানরের খেলা ও সাপ খেলার প্রশিক্ষণ নিতে হয় আগামির আয়-রোজগারের নিশ্চয়তার জন্য। নোয়াখালীর সুবর্ণচর উপজেলার চরবাটা ইউনিয়নের ভুঁঞার হাট সংলগ্ন সড়কের পাশে বেদে পল্লীর অসহায় সুবিধা বঞ্চিত শিশু ওরা। অথচ; একটু সহযোগিতার হাত বাড়ালেই ওরা গড়ে নিতে পারবে নিজেদের ভবিষ্যৎ। বেঁচে থাকার ভাল পরিবেশ ও সুযোগ পেলে তারা হতে পারে আগামীর আলোকিত মানুষ।
সরেজমিনে গেলে দেখা যায়, একজন সরদার এর  নেতৃত্বে পলিথিন দিয়ে তৈরি ১০/১৫টি ছাপড়া ঘর নিয়ে এক সপ্তাহের জন্য আস্তানা গেড়েছে একটি বেদের দল। সড়কের পাশে ঝুপড়ির মতো প্রায় প্রত্যেকটি ঘরের সামনে মহিলারা টিনের চুলায় রাতের রান্না বসিয়েছেন, কেউ রান্নার আয়োজন করছেন। কয়েকজন বসে নানা ধরনের গল্প করছে। পুরুষরা মহিলাদের রান্নার কাজে সহযোগিতা করছেন। শিশুরা ছোটাছুটি করছে এদিক সেদিক । আবার কেউ শিশুদের নিয়ে বানরের খেলা ও সাপ খেলার প্রশিক্ষন দিচ্ছে।
বেদে পল্লীতে দেখা যায়, ছাপড়া ঘরের সামনে বেদে শিশুরা  মনের আনন্দে ছোটাছুটি করে খেলছে। সড়কের পাশে ,পতিত জমিতে,অসুস্থ্যপরিবেশে খোলা মাঠে তীব্র শীতে, মুষলধারে ঝড়বৃষ্টিতে অথবা উড়িয়ে নেওয়া ঝড়ের মুখে মাঠের ময়লাযুক্ত বিছানায় রাত কাটায় অবহেলা ও  বঞ্চনায় চাদরে ঢাকা বেদে শিশুরা। এদের নিয়ে নির্বিকার সভ্য সমাজের সবাই।
খোঁজ জানা যায়, বেদে পল্লীর মেয়ে শিশুটি বড় হয়ে একদিন তার মায়ের মত শালীনতাহীন ভাবে কালোদৃষ্টির রোগ সারানোর মত অদ্ভূত পেশা গ্রহন করবে। সেখানে ভাল উপার্জন না করতে পেরে হয়ত শহরের ভীড়ে কিশোরী মা হয়ে, কোলে নোংরা খাড়ি ওঠা চুলের একটি বাচ্চাকে নিয়ে অশোভনীয় ভিক্ষা পেশা না হয় নিষিদ্ধ পল্লীর অন্ধকার  পথেই হবে তার ঠিকানা। ছেলেরা বড় হয়ে পান খাওয়া দাঁত আর অপরিচ্ছন্ন শরীর নিয়ে ছাপড়া পাহারা দিবে আর সময় সুযোগ মত সাপ ধরা, বানরের খেলা দেখানো, পুকুরে হারিয়ে যাওয়া স্বর্ণ খোঁজা বা কোন বাজারে পাতা লতার ঔষধ বিক্রির মত প্রতারণা মুলক পেশায় নিজেকে ব্যস্ত রাখবে।13
বেদে ফারুক এর স্ত্রী জরিনা খাতুন (৩৫) জানালেন, শিঙ্গা দেওয়া, কোমরের ব্যাথা চিকিৎসা ও দাঁতের পোকা সারিয়ে চলে আমাদের জীবনের চাকা। সংসার চালাতে যেখানে আমরা হিমশিম খাচ্ছি ,সেখানে শিশুদের জীবনে শিক্ষার আলো জ্বালাবো কীভাবে? তাছাড়া বাড়ি ফেরার কথা যেখানে অজানা সেখানে বিদ্যালয়ের কথা তো ভাবাই যায়না। আমাদের যাযাবর জীবনে শিশুদের শিক্ষার কথা ভাবনা তো কালের মহাঅভিষাপ।
অপরিচ্ছন্ন পোশাকে ১২ বছরের কিশোরী  সুমি ও ১৩ বছরের কিশোর মামুন  জানায়,আমাদেরও ইচ্ছে করে বই হাতে বিদ্যালয়ে যেতে, অন্যদের মত শিক্ষিত হতে। কিন্তু আমাদের জন্মই যে আজন্মের পাপ। অশিক্ষিত হয়ে বড় হওয়া আর ঠিকানা বিহীন পথে অন্যের তাড়া খেয়ে বেড়ানো তাদের মত হাজার হাজার বেদে শিশু কিশোর  হারিয়ে যাচ্ছে যাযাবর জীবনের অন্ধকার ছায়া পথে।
বেদে সরদার আব্দুল মান্নান ও শেফালী আক্তার আক্ষেপ করে বলেন, এখন আর সাপ ধরা হয় না গ্রামের মানুষ প্রায় সচেতন। অসচেতন গরীবরা ছাড়া কেউ চিকিৎসা করায় না। আমাদের যাযাবর জীবনের জীবিকা নির্বাহের পৃথিবীটা অনেক ছোট হয়ে আসছে। এমন পরিস্থিতিতে আমাদের শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানোর কথা তো আমরা ভাবতে পারছি না। এমন মানবতর জীবনের চাকায় পৃষ্ট হয়েও আমরা ভিক্ষা চাই না, চাই কাজের বিনিময়ে আমাদের সন্তানদের সামাজিক ভাবে মানুষ করতে।
বেদে মধু মিতা ও চারু বেগম জানায়, তাঁদের বেদে দলে ১৫টি পরিবারে ২২জন শিশু রয়েছে। এভাবে সারা দেশে আমাদের বেদে পরিবারে হাজারও শিশু রয়েছে। তারা আক্ষেপ করে বলেন,দেশের সকল শিশুর জন্য প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামুলক হলেও ,আমাদের শিশুরা বরাবরের মত বঞ্চিতই রয়ে গেলো। শিশুদের আমরা দেশের বোঝা করতে চাই না। জন্মসুত্রে পাওয়া এপেশা এবং যাযাবর  জীবন আমাদের প্রজন্মকে অভিশাপে পরিণত করেছে।
প্রতিবেদকের সামনে জড়ো হওয়া বেদে পল্লীর বেদেনীরা জানায় , থেমে না থাকা সময় আমাদের সাথে বড়ই নিষ্ঠুর আচরণ করছে। পেশা হয়েছে অভিশাপ ,প্রজন্ম চলছে ঠিকানা বিহীন অজানা অন্ধকার পথে।আজ আর সাপ খেলা আমাদের শিশুদের বিনোদন দেয় না। আমাদের শিশুরা কম্পিউটারে গেমখেলে, ইন্টারনেটে বিশ্বভ্রমন করে। তাই সাপের খেলার ব্যবসা আগের মত জনপ্রিয় নেই। এদিকে আইনি বাধায় সাপ ধরা দন্ডনীয় অপরাধ।
এদিকে সাধারণ শিশুরা যখন প্রযুক্তির ছোয়ায় শিক্ষিত আগামীর কথা ভাবছে , তখন এই বেদে শিশুরা তাদের মা বাবার  অভিশপ্ত যাযাবর জীবনের কারনে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। আমরা কি তাদের কথা ভাবছি ? তারা শেওলার মত অন্তহীন  পথে ভেসে চলছে দিক দিগন্তে।
এনিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে, নোয়াখালী সমাজসেবা অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো:বেলাল হোসেন জানান, ধলিত জনগোষ্টি সেবার আওতায় সরকার বেদেদের জন্য সেবা মূলক নানা প্রকল্প নিয়েছে। তবে কিছু সেবা আমরা দিচ্ছি। এ অঞ্চলে বেদেদের পরিসংখ্যান জরিপ কাজ হয়েছিল কয়েক বছর আগে। কিন্ত এরা ভাসমান হওয়ায় এদের সঠিক পরিসংখ্যান করা সম্ভব হয়নি। এদের সহযোগিতা করার জন্য আমরা কতৃপক্ষের কাছে সুপারিশমালা প্রেরণ করেছি।

চলতি সংবাদ