সংকট আর অবহেলার শিকার বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নামকরণের স্থাপনাগুলো
11
মিজানুর রহমান-
সংকট আর অবহেলার শিকার হয়ে গুরুত্বহীন হয়ে পড়ছে চট্টগ্রাম বিভাগের একমাত্র বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিনের নামকরণের স্থাপনাগুলো। সারাবছর এগুলো রক্ষণাবেক্ষণ কিংবা তদারকিতে উপক্ষো থাকলেও ১০ ডিসেম্বর বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন স্মৃতি গ্রন্থাগার ও যাদুঘর কর্তৃপক্ষ আলোচনা সভা, মিলাদ মাহফিল ও দু:স্থদের মাঝে খাবার বিতরণের আয়োজন করেছেন। অথচ; ৪ দিন পূর্বে ৬ ডিসেম্বরও যাদুঘরে দেখা গেছে চরম অব্যবস্থাপনা। বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় স্থাপিত স্কয়ারটিও বিবর্ণ হয়ে আছে। তবে; কার্যকর না হলেও যথারীতি বিগত বছরের ন্যায় এবারও আশারবাণী শুনিয়েছেন সোনাইমুড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রবিউল ফয়সল।
মুক্তিযুদ্ধে দুই নং সেক্টরে যুদ্ধরত রুহুল আমিন ছিলেন নৌ-বাহিনীর যুদ্ধজাহাজ ‘পলাশ’র প্রধান ইঞ্জিনরুমে আর্টিফিসার। বাঙালীর চুড়ান্ত বিজয়ের মাত্র ছয় দিনপূর্বে ১০ ডিসেম্বর খুলনার রূপসা নদীতে যুদ্ধজাহাজ পলাশে দায়িত্বরত অবস্থায় পাকিস্তান বিমানবাহিনীর নিক্ষিপ্ত গোলায় শাহাদৎ বরণ করেন তিনি। মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বপূর্ণ অবদানের জন্য বীরশ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত শহীদ রুহুল আমিনের জন্ম নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলার দেওটি ইউনিয়নের বাগপাঁচড়া গ্রামে (বর্তমানে শহীদ রুহুল আমিন নগর)।
এই বীরের অবদানকে স্মরনীয় করে রাখতে এবং নতুন প্রজন্মের মাঝে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসও চেতনা ছড়িয়ে দিতে তাঁর জন্মস্থানে এবং নিজের ভূমিতে সরকারি উদ্যোগে ২০০৮  সালে শহীদ মো: রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর স্থাপন করা হয় । একই সময়ে বেগমগঞ্জ চৌরাস্তায় বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিন স্কয়ারের নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। অথচ; যে লক্ষ্যে গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেটি ক্রমেই ম্লান হতে চলেছে।
স্থাণীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, মহান মুক্তিযুদ্ধে  তাঁর এ বীরত্ব গাঁথা  ইতিহাস জানার জন্য তাঁর নামে নির্মিত গ্রন্থাগারে এসে নতুন প্রজন্মের দর্শনার্থী ও পাঠকরা সামান্য কিছু বই ছাড়া আর কিছু না পেয়ে হতাশ  হচ্ছেন। জাদুঘরটি আছে নামে মাত্র। এখানের যুদ্ধেরও কোনো স্মৃতি কিংবা প্রামান্য চিত্র নেই। নিয়মিত খোলা রাখা এবং পরিচর্যা করা হয় না গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর । লাইব্রেরীতে নতুৃন নতুন বই সরবরাহ বন্ধের পাশাপাশি গত চার বছর ধরে এখানে পত্রিকা দেয়া বন্ধ রয়েছে ।
গত ৬ ডিসেম্বর বিকালে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর তালা বন্ধ। বারান্দায় কয়েকজন উঠতি বয়সী যুবক ধুমপান করছে। সাংবাদিকের উপস্থিতি টের পেয়ে সরে গেলেও বারান্দায় এবং সামনে রয়েছে ৪-৫টি ছাগল। অপরিস্কার ও অপরিছন্ন পুরো জাদুঘর । উঁকি দিয়ে দেখা যায়- কাচঁ দিয়ে ঘেরা দুটি টয়লেট ব্যবহারের অনুপোযী। গত কয়েকমাসেও এগুলো পরিস্কার করা হয়নি বলে মনে হতে পারো যে কারো।  
কেয়ারটেকার আলাউদ্দিনকে খোঁজ করেও পাওয়া যায়নি। প্রায় ঘন্টাখানেক পর তাঁর ছোট ভাই এসে জাদুঘরের তালা খুলে দেন। এসময় তিনি জানান, আলাউদ্দিন জাদুঘরের কাজেই বাইরে আছেন। তবে অপরিস্কার ও অপরিছন্ন থাকার বিষয়ে জানান- তার ভাইকে যে বেতন দেয়া তা দিয়ে তার পোষায় না ।
এলাকবাসী জানান, প্রায়ই গ্রন্থাগার ও স্মৃতি জাদুঘর বন্ধ থাকে। দুর দুরান্ত থেকে কেউ এটি দেখার জন্য আসলে বাড়ী থেকে কেয়ারটেকারকে ডেকে আনতে হয়। অনেক সময় এটি তালা বন্ধ দেখে অনেক দর্শনাথী না দেখেই চলে যায়। তাছাড়া এটি নামেই জাদুঘর। মুক্তিযুদ্ধের কিছু বই ছাড়া  যুদ্ধে ব্যবহৃত সমরাস্ত্র অথবা প্রামান্য চিত্র না থাকার কারণে এলাকার ছাত্র যুবকরা ,শিক্ষার্থীরা এমনকি দুর দুরান্ত থেকে আসা দর্শনার্থীরা হতাশ হয়ে ফিরে যান। যার ফলে দিন দিন কমছে দর্শনার্থীর সংখ্যা। তবে; প্রশাসনের কেউ আসার খবর পেলে সেসময় এটি পরিস্কার পরিছন্ন করা হয়। তাছাড়া কোনো নৈশ প্রহরী না থাকায় রাতেই এটি বখাটে ও মাদকসেবীদের আড্ডাখানায় পরিণত হয়।
জাদুঘরও লাইব্রেরীতে থেকে এক থেকে দেড়শত গজ দুরেই থাকেন বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ মো. রুহুল আমিনের ছোট ছেলে শওকত হোসেন। শারীরিকভাবে কিছুটা অসুস্থ হওয়ার কারণে তাকে খোঁজ করেও পাওয়া যায়নি। নৌবাহিনী কর্তৃক প্রায় ২৭ বছর আগে তৈরীকৃত দুই কক্ষের পাকা ভবনটিতে স্ত্রী ও সন্তান নিয়ে তার বসবাস।
শওকত হোসেনের স্ত্রী রাবেয়া বেগম জানান, প্রতি মাসে সরকার থেকে প্রাপ্ত ভাতার একটি অংশ ও ব্যাংকে রাখা এফডিআরের তিন মাস অন্তর অন্তর পাওয়া লভ্যাংশ দিয়ে তাদের সংসার কোনো মতে চলে যাচ্ছে। তবে যে ভবনটিতে থাকেন সেটি অনেকে আগেই বসবাসের অযোগ্য হয়ে পড়েছে। বর্ষকালে এ ভবনে থাকা যায় না। কয়েকবছর আগে একবার সংস্কার করা হলেও তা এখন একেবারের বসবাসের অযোগ্য। দুই মাসপূর্বে নৌবাহিনীর পক্ষ থেকে পরিদর্শন করে গেছেন। তাঁরা পুনরায় একটি ভবন করে দেয়ার আশ্বাস দিলেও বুঝতে পারছেনা আদৌ এটি হবে কিনা?
সোনাইমুড়ী অন্ধ কল্যাণ সমিতির সাধারন সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোস্তফা ভূইঁয়া আক্ষেপ করে বলেন- স্বাধীনতার দীর্ঘ দিন পর সরকার তাঁর নামে যে গ্রন্থাগার ও জাদুঘর করে দিয়েছেন সেটি যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায়  ভবিষ্যত প্রজন্মের কাছে আমরা অপরাধী হয়ে থাকবো। এ ব্যাপারে প্রশাসনের পক্ষ থেকে জরুরী ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করার দাবি জানান তিনি।11
এদিকে সড়ক বিভাগের উদ্যোগে বেগমগঞ্জের চৌরাস্থায় স্থাপিত বীরশ্রেষ্ঠ রুহুল আমিনের নামে একটি স্মৃতি স্কয়ারটি দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক নেতাদের ব্যানার, পোস্টার আর ফেস্টুনে ঢেকে থাকলেও মুক্তিযোদ্ধাসহ সচেতন নাগরিকেদের দাবীর প্রেক্ষিতে এটি পোস্টার ব্যানার থেকে মুক্ত হয়। কিন্তু ২০১২ সালে উদ্বোধনের সময় স্কয়ার কাম ফোয়ারটির যে সৌন্দর্য ছিল সেটি এখন ধুলো বালিতে বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে। পানির পোয়ারাটিও  অচল। সৌন্দর্য বর্ধনের অনেক জিনিস নেই। এনিয়ে ক্ষোভ রয়েছে মুক্তিযোদ্ধাসহ সচেতন নাগরিকদের।
বেগমগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার আবুল হোসেন বাঙালী ক্ষুব্দ কন্ঠে বলেন- প্রশাসনের নাকের ডগায় এ স্মৃতি স্কয়ারের বেহাল অবস্থা। সড়ক বিভাগ এটি তৈরি করে দিলেও এর রক্ষনাবেক্ষনের দায়িত্ব চৌমুহনী পৌরসভাকে দেয়া হয়। কিন্তু এর কোন বিন্দুমাত্র দায়িত্বও পালন করে না। বছরের ২৬ মার্চ ও ১৬ ডিসেম্বর আসলে কিছু আলোকসজ্জা করা হয়। আর বাকী সময়ে থাকে এটি অরক্ষিত।
প্রধানমন্ত্রীর ব্যক্তিগত সহকারী সোনইমুড়ি-চাটখিলের কৃতি সন্তান আলাহজ্ব জাহাঙ্গীর আলম চলমান নোয়াখালীকে জানান, চট্রগ্রাম বিভাগের মধ্যে একমাত্র বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিনের জন্ম স্থান রুহুল আমিন নগরে। সোনাইমুড়ী বাইপাসে একটি মুর‌্যাল স্থাপন, স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রান্থগারটিতে নতুন নতুন বই দেয়াসহ বেশ কিছু উদ্যোগ তিনি নিয়েছেন।
বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ রুহুল আমিন স্মৃতি জাদুঘর ও গ্রন্থাগারটির নানা অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বিষয়ে কথা হয় সোনাইমুড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ রবিউল ফয়সলের সাথে। বিগত বছরের ন্যায় এবারও আশার বানী শুনিয়েছেন তিনি। গত বছর একই সময়ে তিনি জানিয়েছিলেন- এখন থেকে (ডিসেম্বর ২০১৬) জাদুঘরে পত্রিকা সরবরাহ করা হবে। অথচ; এক বছরে কিন্তুু একটি পত্রিকাও সেখান যায়নি । এনিয়ে কেয়ারটেকারের ওপর দোষ চাপাতে দেরী করেননি তিনি। তাঁর মতে- কেয়ারটেকার তাঁর (ইউএনও) নিয়ন্ত্রানধীন না হওয়ায় যতসব অব্যবস্থাপনা। এবারও তিনি জানালেন এখন থেকে সেখানে পত্রিকা যাবে এবং বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে আলাপ করে উদ্যোগ নিবেন।
প্রসঙ্গত ঃ মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে বীরত্বেপূর্ণ অবদানের জন্য যে ৭জন বীর শ্রেষ্ঠ খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন তাদের অন্যতম হচ্ছেন এক সময়ের বেগমগঞ্জ উপজেলা বর্তমানে সোনাইমুড়ী উপজেলা দেউটি ইউনিয়নের বাগপাঁচরা গ্রামের রুহুল আমিন। ১৯৩৪ সালে বাগপাঁচরা গ্রামে জন্ম গ্রহণ করেন রুহুল আমিন। ৩ভাই ও ৪ ভাই নিয়ে ছিলো তাদের সংসার। শিক্ষা জীবন শুরু করেন বাগপাঁচরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তার পর ভর্তি হন আমিশাপাড়া কৃষক উচ্চ বিদ্যালয়ে। ১৯৫১ সালে নৌ-বাহিনীতে নায়েক হিসেবে চাকরি জীবন শুরু করেন।
12
চলতি সংবাদ