নোয়াখালীর কৃষি : সরকারের সদিচ্ছা ও বাস্তব ভিত্তিক পরিকল্পনা জরুরী
বি জ ন সে ন
চলমান নোয়াখালীর ১৩ জানুয়ারী সংখ্যায় জেলার কৃষিক্ষেত্রের এক ভয়াবহ দুঃসংবাদের চিত্র ফুটে উঠেছে। প্রতিবেদক সরকারী সূত্রে প্রাপ্ত তথ্য নির্ভরতা থেকে লিখেছেন, জেলায় এবারও ৬৬ হাজার হেক্টর জমিতে শুকনো মৌসুমে কোন চাষাবাদ হবেনা। সেচ সুবিধা না থাকা এবং চরাঞ্চলে লবনাক্ততা এর অন্যতম কারন। এই বিষয়টি নিয়ে সরকারি বেসরকারি পর্যায়ে অনেক আলোচনা, উর্ধতন কতৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষন, রাজনৈতিক দেনদরবার হয়েছে। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। শুকনো মৌসুমে সেচ সুবিধা বৃদ্ধির জন্য পর্যাপ্ত খাল খনন, রাবার ড্যাম নির্মান, ভৌগলিক অবস্থান ভেদে সেচ প্রকল্প গড়ে তোলার দাবীটি বেশ কয়েকজন রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের করকমলে নিবেদিত ছিল। কাজের কাজ কিছুই হয়নি। ফলে রাষ্ট্র প্রতিবছর প্রায় ১ হাজার কোটি টাকার শষ্য উৎপাদনে বঞ্চিত হচ্ছে।
আমরা জানি প্রতিবছর সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নামে কি পরিমান খয়রাতি চাউল,গমের হরিলুট হয়। এর সিকি ভাগও যদি স্থানীয় সরকারের ব্যবস্থাপনায় কৃষির জন্য সেচ সুবিধার কাজে ব্যায় করা হতো তা’হলে আমাদের জেলায় এত অনাবাদি জমি থাকতোনা। সেচ সুবিধা বৃদ্ধি করা গেলে শুকনো মৌসুমে জমির লবনাক্ততাও কমে যেত বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।  আমাদের দূর্ভাগ্য হলো যেখানে ব্যক্তি লাভের হিস্যা বেশী সেখানেই আমাদের জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসন সরকারের সুবিধাগুলো নিশ্চিত করতে বেশী আগ্রহী। পাশের জেলা কুমিল্লার কৃষি ক্ষেত্রের দৃশ্যপট যদি বিবেচনা করি তা’হলে তুলনামূলক ভাবে আমরা পিছিয়ে আছি। অথচ আমাদের চাইতে সে জেলোর চাষাবাদ যোগ্য জমির পরিমান কয়েকশত গুন কম।সেখানে ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে সেচের পাশাপাশি ঝলাধারের পানি সংরক্ষন করেও চাষাবাদ হচ্ছে। নোয়াখালী জেলায় ছোট বড় খালের সংখ্যা বিভিন্ন সূত্র মতে একশত তেইশটি। এর মধ্যে বড়,মাঝারি ও ছোট ছোট সংযোগ খাল রয়েছে। উপকূলীয় এলাকায় প্রতি বছর বাড়ছে পলিমাটির চর। সে চর গুলোকে চাষাবাদের আওতায় আনতে প্রতি বছরই নতুন করে এলাকাভেদে খাল খনন বা  পুরাতন খালের সাথে সংযোগ করার আবশ্যকতা বিদ্যমান। পাশাপাশি বড় বড় জলাধার নির্মান করা যেতে পারে। তাতে কৃষি মৎস ও পশু সম্পদের অবারিত দ্বার উন্মোচিত হবে। পর্যাপ্ত কর্ম সংস্থানের পাশাপাশি সুযোগ হবে সামগ্রিক কৃষি খাতে।এ’ লক্ষে কিছু প্রস্তাবনা এখানে উপস্থাপিত হলো।
নোয়াখালী সামগ্রিককৃষির ক্ষেত্রে অভাবিত সম্ভাবনাকে যে ভাবে কাজে লাগানো যতে পারে।  
১.পলিমাটির প্রলেপে জেগে ওঠা চরের গঠন প্রকৃয়া থেকে স্থায়ী হওয়া পর্যন্ত নজরদারিতে রাখতে হবে যা’
যথাযথ ভাবে ভুমি জরিপ করে স্থানীয় ইউনিয়ন ও উপজেলা প্রশাসনের নিকট  দেখভালের দায়িত্ব দিতে হবে, তাতে বে-দখল রোধকরা সম্ভব হবে।
২. ল্যন্ড জোনিং করে পরিকল্পিত ভাবে আবাসিকএলাকা, ফসলের মাঠ,  বেড়ীবাঁধ,বনায়ন,মৎস ও পশু পালন এলাকা,  গোচারণভূমি,শিক্ষা, স্বাস্থ্য, আশ্রায়ন, অভয়ারণ্য, পর্যটন/বিনোদনকেন্দ্র ,ক্ষুদ্র ও মাঝারী শিল্পাঞ্চল, সরকারী/বেসরকারীউদ্যোগে  উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহন করা।
৩.যাতায়ত ব্যবস্থার উন্নয়ন যেমন, রেল লাইন সম্প্রসারণ,  উপকূল জুড়ে প্রশস্থ চক্রাকার সড়ক পথ নির্মান, অভ্যন্তরীন নৌ-যোগাযোগ, কৃষি নিরাপত্তার জন্য বিমান বন্দর নির্মাণ করা ও  খাদ্য প্রকৃয়াজাত  অঞ্চল গড়ে তোলা।
৪.কেবল মাত্র মধ্যবিও,নিম্ন মধ্যবিও ও প্রান্তিক চাষীদের জন্য  সহজ শর্তে শস্যঝৃণ,শস্যবীমা চালুকরা।
৫.সরকারের শস্যক্রয় নীতিতে কৃষকদের কাছ থেকে সরাসরি  কৃষিপন্য ক্রয় অথবা সংরক্ষন পর্যায়ে শষ্যের বিপরিতে সল্প সুদে ঋণ দেয়া।
৬.কৃষকদের জন্য এলাকা বিবেচনা করে বাজার সৃষ্টি করা, যাতে ভোক্তা ও বড় ক্রেতাদের কাছে উৎপাদক সরাসরি পণ্য বিক্রি করার সুযোগ পায়।
৭.সেচ সুবিধার জন্য অভ্যন্তরীণ খাল খনন ও বড় বড় পুকুর খনন করে রক্ষনা বেক্ষনের  ব্যবস্থা নিশ্চত করা।তাতে পতিত জমি উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব হবে এবং গো-সম্পদ. মৎস সম্পদ, হাঁস-মুরগীর উৎপাদন, বাড়ির আঙ্গিনায় মৌসুমী সবজি বাগান বৃদ্ধি ও ছোট ছোট কৃষি ভিত্তিক আয় বর্ধক কর্মসূচী বৃদ্ধি করা সম্ভব হবে এবং গ্রামীন নারীদের আয়বর্ধক কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে।
৮.বড় বড় খালগুলোর  বহুমুখী  ব্যবহারের মাধ্যমে স্থানীয় জনগনের  আয়ের উৎস নিশ্চিত করা ।যেমন ঃ খালের পাড়ে সামাজিক বনায়ন কর্মসূচী, সমবায়ের মাধ্যমে মৎস চাষ, সবজির বাগান করা,মৌসুমি ফলের বাগান, নার্সারি করা, পিকনিক/বিনোদন স্পটকরা ইত্যাদি।
৯.সকল ধরনের সরকারী বা খাস জলাশয় গুলোকে জন প্রতিনিধিত্বশীল প্রত্রিষ্ঠানের হাতে ন্যস্ত  করা।      জলাশয়গুলোকে সমবায় অথবা সামাজিকদল গঠন করে অস্থায়ী মালিকানা বা ইজারার ভিওিতে বন্টন করা যেখানে গ্রামীন কর্মজীবি নারীর অংশিদারিত্ব থাকবে।
১০.গবাদি পশুর উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য উপযোগী স্থান নির্ধারনের মাধ্যমে গো-চারণ ভূমি, খামার (বাতান) সরকারী /বেসরকারী উদ্যোগে প্রজনন কেন্দ্র (স্থায়ী/ অ-স্থায়ী )ও চিকিৎসা কেন্দ্র গড়ে তোলা। গবাদি পশুর প্রজনন ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার জন্য আধুনিক সংরক্ষন ব্যবস্থা সম্বলিত মোবাইল ভ্যান সংশ্লিষ্ট বিভাগকে প্রদান করা।
প্রাকৃতিক দূর্যোগ থেকে পশু সম্পদকে রক্ষা করার জন্য ক্যাটেল শেল্টার নির্মান করা যা, বহুমূখী ব্যবহার উপযোগী করা যেতে পারে।
১১.এলাকার চাহিদা বিবেচনায় নারীদের জন্য আলাদা অর্থনৈতিক কর্ম পরিকল্পনা গ্রহন করা।  যেমন.বাড়ির আঙ্গিনায় পরিকল্পিত সবজি বাগান ক্ষুদ্র পল্ট্রি খামার গড়ে তোলা, নার্সারী করার জন্য বিনা সুদে (কেবলমাত্র সার্ভিস চার্জ সংযোজন করা যেতে পারে) ক্ষুদ্র ও ¯ল্প মেয়াদি ঋণ নিশ্চিত করা।              
১২. উপকূলের নারী ও শিশুদের প্রজনন শিক্ষা ,স্বাস্থ্য, পুষ্টি, গ্রামীন জনপদে প্রচলিত অবলুপ্ত প্রায় বিনোদন গুলোকে পুনঃ উদ্ধার করে তা’ প্রচলন করা। গ্রাম বাংলার আবাহমান কালের কৃষি সংশ্লিষ্ট সংস্কৃতিকে পুনরজ্জিবিত করা।
১৩. পরিবর্তিত জলবায়ূ,পরিবেশ বিষযে উপকূলের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাকৃতিক দূর্যোগ মোকাবেলায় সে^চ্ছায় সেবামূলক প্রশিক্ষন ও প্রযুক্তিগত শিক্ষার সুযোগ তৈরী করা।
১৪.   অতি দরিদ্র মানুষের জন্য ভিজিএফ, ভিজিডি কর্মসূচীর মাধ্যমে, জৈবসারউৎপাদন, প্রাকৃতিক বালাই নাশক গাছ ও গুল্মলতা উৎপাদন,অবকাঠামো সংস্কার সরকারের সামাজিক নিরাপত্বা কর্মসূচীর আওতায় এনে, পরিবেশ সংরক্ষন কর্মসূচীতে কর্মসৃজন করা ।
উল্লেখিত উদ্যোগগুলো নিশ্চত করা গেলে নোয়াখালীর ১৫০ বর্গ কিলোমিটার উপকূলীয়  অঞ্চলে দেশের বৃহদ্ কৃষি ও কৃষিজাত পন্য উৎপাদন অঞ্চল হিসাবে গড়ে তোলা যাবে। যার ফলে বর্তমানের চাইতে চার গুন খাদ্যউৎপাদন বৃদ্ধি,কয়েক হাজার লোকের কর্মসংস্থান,দেশী-বিদেশী  উদোক্তাদের  বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের বিভিন্ন প্রকল্প গড়ে তোলার সম্ভাবনা সৃষ্টি হবে। এ ছাড়াও সুযোগ তৈরী হবে পর্যটনের অপার সম্ভাবনা।   
বিজন সেন
সংবাদ কর্মী।
নোয়াখালী প্রতিনিধি, চ্যানেল আই’ ও দৈনিক ভোরের কাগজ।
কৃষি ও অর্থনীতি