ছেলে ফিরেনি, দেশতো স্বাধীন হয়েছে
11
-রুদ্র মাসুদ-
মো. সিরাজ মিয়া ১৭-১৮ বছরের টগবগে তরুন। বাবা জিনু মিয়া শ্রমিকের চাকরি করতেন খুলনার পিপলস্ জুট মিলে। তখনো যুদ্ধ শুরুই হয়নি। পরিবারে বাড়তি উপার্জনের জন্য বাবার সাথে তিনিও পাড়ি জামান খুলনায়। সেখান থেকে গিয়ে যশোরের ঝিনেদার বিখ্যাত সুইট হোটেলে শ্রমিকের চাকরি নেন। এদেশের মুক্তিকামী শ্রমিক-মেহনতী জনতার সাথে সিরাজ মিয়াও অংশ নেন স্বাধীনতা সংগ্রামে। অস্ত্র হাতে তুলে সশস্ত্র যুদ্ধে নামেন পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীকে প্রতিরোধে। সন্মুখ যুদ্ধে তিনদিন একাধারে লড়াই করে যশোরের ‘বিষয় খালী’ যুদ্ধে শহীদ হন তিনি। এতদূর থেকে মরদেহ বাড়িতে পাঠানো অসম্ভব ছিলো, তাই সহযোদ্ধারা সেখানেই তাঁকে সমাহিত করেন।
১৬’ ডিসেম্বর বিজয় অর্জিত হয়। বাংলার আকাশে উদিত হয় স্বাধীনতার নতুন সুর্য। কিন্তু সিরাজ মিয়ার কোন খোঁজ জানেন না তাঁর মা ছবুরের নেছা। তিনি শুধু জানতেন স্বামীর সাথে বড় ছেলে সিরাজ মিয়াও খুলনায় চাকরি করছেন। ৭২’র জানুয়ারির শেষ ভাগে যশোর থেকে একটি চিঠি আসে তাঁদের গ্রামের বাড়ি নোয়াখালীর বেগমগঞ্জ থানার (বর্তমান সোনাইমুড়ি উপজেলা) আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামের বড় বাড়িতে। মুজিব বাহিনীর যশোরের ঝিনেদা জোনের পদ্দাকর ইউ,সি শ্রীরামপুর ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডারের প্রেরিত সেই চিঠি পেয়ে যেনো আকাশ ভেঙ্গে পড়ে ছবুরের নেছার মাথায়। কে জানতো এচিঠিতেই মহান মুক্তিযুদ্ধে তাঁর আদরের সন্তানের আত্মদানের বিষয়টি লুকায়িত রয়েছে।
পরিবারের বড় ছেলেকে হারিয়ে পাগল প্রায় মা ছবুরের নেছা। কারণ তখনো স্বামীর কোন খবরও জানে না তিনি। ছোট তিন ছেলের মধ্যে সুরুজ মিয়া অন্ধ, অপরজন চাঁন মিয়া একই সাথে প্রায় অন্ধ এবং শারিরীক প্রতিবন্ধী আর অপর ছেলে সোহরাব মিয়া তখন একেবারেই কোলের শিশু। একটা সময় স্বামী ফিরে আসে, আবার কাজে ফিরে যায় খুলনায়। এভাবেই দরিদ্র ছবুরের নেছার দিন চলে যায় বছরের পর বছর। সরকার প্রদত্ত শহীদ পরিবারের কোন সুযোগ সুবিধাই গত ৪২ বছরে জোটেনি তার কপালে। মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ  ট্রাস্টে বারবার আবেদন করেও সাড়া পাননি তিনি।
এক যুগ আগে স্বামীকে হারিয়েছেন। প্রায় ১০ বছর পূর্বে একদিন নিখোঁজ হয়ে যায় প্রতিবন্ধী ছেলে চাঁন মিয়া। ছোট ছেলে সোহরাব মিয়াও (৪৪) পক্ষাঘাতগ্রস্থ। এলাকাবাসীর সহায়তায় নির্মিত দুই কামরার ছোট্ট ঘরে সন্তান, নাতি, নাতনিকে নিয়ে ছবুরা বেগমের বসবাস। এই ঘরটিই এখন তাঁদের একমাত্র সম্বল। কোন জমি জিরাতও নেই। শেষমেষ গত জুন বেগমগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার আবুল হোসেন বাঙালীর আপ্রাণ চেষ্টায় সোনাইমুড়ি উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার গোলাম মাওলার মাধ্যমে দু:স্থ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের ভাতাভোগীদের তালিকায় স্থান হয় ছবুরের নেছার। এখন মাসে ৫ হাজার টাকা করে ভাতা পান তিনি। এতোও তাঁর সন্তুষ্টির শেষ নেই। তবে; তিনি চান শহীদ পরিবারের রাষ্ট্রীয় সম্মান।
কেমন আছেন শহীদ জননী ছবুরের নেছা। সেই খোঁজ জানতে বেগমগঞ্জ উপজেলার মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কমান্ডার আবুল হোসেন বাঙালীকে সাথে নিয়ে সোনাইমুড়ি উপজেলার আমিশাপাড়া ইউনিয়নের কেশবপুর গ্রামের বড় বাড়িতে গেলে শহীদ জাননীর দু:খী জীবনের চিত্র দেখে মনে হয়েছে যেনো দু:খের সাগরের সামনে দাঁড়িয়ে। সাংবাদিক পরিচয় জানার পর কিছুটা হতচকিত তিনি। কি কারণে এসেছেন ? কোথা থেকে এসেছেন ? এমন হাজারো প্রশ্ন তাঁর চোখে মুখে। কিন্তু সাথে একজন মুক্তিযোদ্ধা থাকায় এসব ছাপিয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বসতে বলতেও ভুল করেননি ৭৮-৮০ বছর বয়সী ছবুরের নেছা।
আপনার ছেলেতো মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছে। তাঁর কথা মনে আছে ? কিভাবে শহীদ হয়েছে, কেথায় শহীদ হয়েছে কিছু স্মরণ আছে ? এমন প্রশ্ন করতেই ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে থাকেন কিছুক্ষণ। এরপর ক্ষীণ কন্ঠে বলেন - ‘সায় সামাইন্য লেয়া হড়া কইচ্ছে আর কি। এইটা দি ত কোন ভালা চাকরি হাই তো ন। বাপের লগে খুলনা গেছিলো শ্রমিকের কাজ কইত্তো। হিঁয়ান্তুন যুদ্ধে গেছে সিরাজ। আমরা এত কিছু কইতাম হাইত্তান্ন। স্বাধীনের হরে চিঁডি আইছেআর সিরাজের মরনের খবর হাইছি।’
পড়ন্ত বিকালে ঘরের সামনে চেয়ারে বসে কথা বলতে বলতেই ঘর থেকে দুটি চিঠি দিতে বলেন ছোট ছেলের বউকে। এ দুটি চিঠির একটি হচ্ছে মুজিব বাহিনীর যশোরের ঝিনেদা জোনের পদ্দাকর ইউ,সি শ্রীরামপুর ক্যাম্পের ক্যাম্প কমান্ডারের প্রেরিত চিঠি এবং অপরটি হচ্ছে স্বাধীনতা সংগ্রামে সিরাজ মিয়ার আত্মদানের স্বীকৃতি হিসাবে শেখ মুজিবর রহমানের স্বাক্ষরিত মুদ্রিত একটি চিঠি। দীর্ঘ ৪১ বছরে চিঠি দুটিও বিবর্ণ হয়ে গেছে। লেমিনেটিং করে কোন রকমে রক্ষা করা চিঠি দুটিই এখন শহীদ জননী ছবুরের নেছার সম্বল।
ছেলেকে নিয়ে দু’একটা স্মৃতিচারণমুলক কথা বলছেন ছবুরের নেছা। কথা বলতে বলতেই সুর্য ডুবে যায়। অন্ধকার নামে বড় বাড়িতে (সিরাজ মিয়াদের বাড়ি)। আশপাশের সবগুলো ঘরে বৈদ্যুতিক আলো জ্বলে উঠে। শুধু অন্ধকার সিরাজ মিয়াদের ঘরে। সেই অন্ধকার তাড়াতে কেরোসিনের কুপি’র (স্থানীয় ভাষায় চেরাগ) আলোয় আবার ছেলের কথা তোলেন ছবুরের নেছা। যার ছেলে স্বাধীনতার সূর্য ছিনিয়ে আনতে গিয়ে জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন, সূর্য ডুবার পর তাঁর ঘরের অন্ধকার তাড়াতে জ্বলে কেরোসিনের কুপি...
ছেলেকে ফিরেনি, কিন্তু দেশ তো স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীনতা তাঁকে দেখবে না, ছেলে বেঁচে থাকলে তো তাঁকে দেখতো। সিরাজ মিয়া বেঁচে থাকলে হয়তো এতোটা আর্থিক টানাটানিতে জীবন কাটাতে হতো না বলেও কিছুটা হতাশা ব্যক্ত করেন।  ক’দিন বাঁচবেন আর। শেষ বেলায় শহীদ পরিবারের রাস্ট্রীয় সম্মান ও সুযোগ সুবিধাটুকু নিশ্চিত হয়, তাহলেও কিছুটা খুশী হতেন- এমনটি দাবি ছবুরের নেছার। এসময় উপস্থিত কেশবপুর গ্রামের মুক্তিযোদ্ধরাও সিরাজ মিয়ার পরিবারকে সরকার প্রদত্ত শহীদ পরিবারের রাষ্ট্রীয় সুযোগ সুবিধা প্রদানের দাবি তোলেন।
শহীদ জননীর সাথে কন্ঠ মিলিয়ে আশ্বস্ত করেন আবুল হোসেন বাঙালী। একবার যেহেতু মুক্তিযোদ্ধা ভাতা হয়েছে, একসময় শহীদ ভাতাসহ অন্যান্য সকল সুযোগ সুবিধা প্রাপ্তির ব্যাপারে সহযোগীতার আশ্বাস দেন তিনি। একজন মুক্তিযোদ্ধার এমন আশ্বাসে আশান্বিত হন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার মা ছবুরা খাতুন।
শীত বাড়তে থাকে। সাথে পাল্লা দিয়ে অন্ধকারও। কেরোসিনের কুপি’র আলো শহীদ জাননীর ঘরের অন্ধকার কতটুকু দুর করবে সেই নিশ্চয়তা না থাকলেও আমাদের ফেরার পথে আশীর্বাদ করতে ভুলেন নি তিনি।

সেই চিঠি-
মো : সিরাজ মিয়া, পিতা মো: জিনু মিয়া, গ্রাম : কেশবপুর, ডাকঘর-পদিপাড়া বাজার, থানা-বেগমগঞ্জ, জিলা : নোয়াখালী। একজন গেরিলা মুজিব বাহিনী মো : সিরাজ মিয়া যশোহর জিলার ঝিনেদা মহকুমার বিখ্যাত ‘সুইট হোটেলে’ কাজ করতো। জাতীয় মুক্তির সংগ্রাম চলাকালে সে মুক্তি সংগ্রামের সশস্ত্র অবস্থায় অংশগ্রহণ করে। বিগত ৫টি মাস যাবত সে সংগ্রামের অগ্রনায়ক ছিলেন। বিখ্যাত ‘বিষয় খালী’ যুদ্ধে তিন দিন একাধারে যুদ্ধ করে এ বীর সন্তান শত্রুর গুলিতে শাহাদাত বরণ করেন। শহীদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করি।
দে. হোসেন।
২/১/৭২
(সিল)
ক্যাম্প কমান্ডার
মুজিব বাহিনী
বাংলাদেশ সরকার
গেরিলা মুজিব বাহিনী
ঝিনেদা জোন যশোহর
পদ্দাকর ইউ,সি, শ্রীরামপুর ক্যাম্প।

সিরাজ মিয়ার পিতাকে লিখা শেখ মুজিবুর রহমানের চিঠি-
স্বাধীনতার পর টাইপ করা চিঠিতে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শহীদ সিরাজ মিয়ার পিতাকে লেখা চিঠিতে উল্লেখ করেন-
‘আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামে আপনার সুযোগ্য পুত্র আত্মোৎসর্গ করেছেন। আপনাকে আমি গভীর দুঃখের সাথে জানাচ্ছি আমার আন্তরিক সমবেদনা। আপনার শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতিও রইল আমার প্রাণঢালা সহানুভূতি’।
এমন নি:স্বাথ মহান দেশ প্রেমিকের পিতা হওয়ার গৌরব লাভ করে সত্যি আপনি ধন্য হয়েছেন।
‘প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে আপনার পরিবারের সাহয্যার্থে আপনার সংশ্লিষ্ট মহকুমা প্রশাসকের নিকট -১০০০/= (এক হাজার) টাকা পাঠানো হলো। আপনি উক্ত টাকা মহকুমা প্রশাসকের নিকট থেকে গ্রহণ করুন।
আমার প্রাণভরা ভালবাসা ও শুভেচ্ছা রইল।
শেখ মুজিব।
২২-১-৭৩
----
এই দুটি চিঠির পরও শহীদ পরিবারের প্রাপ্য রাষ্ট্রকর্তৃক নির্ধারিত শহীদ পরিবারের সুযোগ সুবিধা পেতে সিরাজ মিয়ার পরিবারকে আরো কতদিন অপেক্ষা করতে হয়, তা কে জানে।