অস্ত্র নয় ঐক্যবদ্ধ মনোবলই ছিলো বড় পুঁজি
-আবু নাছের-11
চার ভাই বোনের মধ্যে আমি সবার বড়। তখন বসুরহাট উচ্চ বিদ্যলয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র থাকা অবস্থায়ই থানা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম। পড়াশোনার ফাঁকেই ইপিআরের ৩ মাসের একটি প্রশিক্ষণ ছিলো। বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের পরই বুঝে গিয়েছিলাম যুদ্ধ অনিবার্য। বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ক্ষুধা-দারিদ্র ও শোষণমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলতে সেই যুদ্ধের মানসিক প্রস্তুতিও ছিলো। ২৫ মার্চের পর শুরু হয় আমাদের প্রস্তুতি। যুদ্ধে অংশ নিতে ভারতে যাই এপ্রিলের মাঝামাঝি সময়ে। প্রায় দুই মাস মতিনগর ও মেলাঘর প্রশিক্ষণ  ক্যাম্পে প্রশিক্ষণ নিয়ে জুনের প্রথম সাপ্তাহে ফিরে আসি। তখন কোম্পানিগঞ্জ থানা বিএলএফ’র কমান্ডার ছিলেন চৌমুহনী কলেজের সাবেক জিএস আব্দুর রাজ্জাক। পরবর্তীতে কমান্ডারের দায়িত্ব নেন ওবায়দুল কাদের। তাঁর নেতৃত্বেই সাত ডিসেম্বর প্রত্যুষে শত্রুমুক্ত হয় কোম্পানিগঞ্জ।
যুদ্ধকালীণ সময়ে ডাকসুর সমাজকল্যাণ সম্পাদক শহীদ অহিদুর রহমান অদুদসহ ৮জন সহযোদ্ধাকে হারিয়েছি। ৪ঠা সেপ্টেম্বর বামনী বেড়ির ওপর পাকিস্থানী বাহিনী ও রাজাকার মিলিশিয়াদের সাথে সন্মুখ যুদ্ধে ৬জন সহযোদ্ধাকে হারাই। সেদিন আমাদের দলে ছিলেন ১০জন মুক্তিযোদ্ধা। পেটে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলাম আমি। এছাড়া বিএলএফ কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাক, কেফায়েত উল্যা এবং আবুল কালাম বেঁচে যায়। আমরা ইলিশ মাছে নৌকায় চড়ে চাপরাশির হাটে গিয়ে আশ্রয় নিয়েছিলাম একটি বাড়িতে। সেখান থেকে কাছারির হাটের একটি বাড়িতে গিয়ে আশ্রয় নিই। যেখানে প্রায় একমাস আমার চিকিৎসা চলে। গ্রাম্য ডাক্তার এবং চৌমুহনী থেকে ডাক্তার এসে গোপনে আমার চিকিৎসা করতো। সুস্থ হয়ে আবার ফিরে যাই যুদ্ধে। জীবনের মায়া ত্যাগ করে সেদিন দেশ মাতৃকার জন্য যুদ্ধ করেছিলাম।
কিন্তু; ১৫ আগষ্ট স্বপরিবারে বঙ্গবন্ধুর হত্যাকান্ডের পর পাকিস্তানের প্রেতাত্মারা এদেশে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিলো। যারা অসাম্প্রাদিয়ক বাংলাদেশের চেহরাই ধ্বংস করেনি যুদ্ধপরাধীদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। আর আমরা লক্ষে পৌঁছাতে পারিনি। আমি আশাবাদী লোক, স্বপ্ন দেখি। বাঙালী বারবার সংগ্রাম করেছে, বিজয় আমাদের হবেই। যে স্বপ্ন দেখেছি, ধীরে ধীরে সেই স্বপ্নের লক্ষ্যে পৌছাবে একদিন এই দেশ। এমন আশার কথা শুনিয়েছেন চার সন্তানের জনক এই যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা।
রণাঙ্গনের দিনগুলি-
পাকিস্তানী বাহিনী ছিলো সুজজ্জিত-উন্নত প্রশিক্ষিত। তাদের এদেশীয় দোসর রাজাকার আলবদররাও ছিলো অস্ত্রে সজ্জিত। বিপরীতে আমাদের কাছে অস্ত্র ছিলো সীমিত। তবে; আমাদের গ্রুপের কাছেও ছিলো এসএলআর, স্টেনগান, রাইফেল, এলএমজি এবং বেয়নেট। আমাদের মনোবল ছিলো জনসাধারণ এবং ঐক্যবদ্ধ মনোবল। মুক্তিকামী জনতার অকুণ্ঠ সমর্থন আমাদের সাহস জুগিয়েছে।
যুদ্ধের তখন চুড়ান্ত পর্যায়। জেলা থেকে সিদ্ধান্ত মোতাবেক কোম্পানিগঞ্জে যুদ্ধরত সাহসী মুক্তিযোদ্ধাদের একত্রিত করে দুটি দলে ভাগ করা হয়। আমাদের গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন বিএলফ কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাক এবং অপর গ্রুপের নেতৃত্বে ছিলেন খিজির হায়াত খান।  
৪ সেপ্টেম্বর সকালে তখনকার থানা বিএলএফ কমান্ডার আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বাধীন মুক্তিযোদ্ধাদের আমাদের গ্রুপটি মুছাপুরের বাংলাবাজারে (তখনকার পাকিস্তান বাজার) যায়। খিজির হায়াত খানের নেতৃত্বাধীন গ্রুটি রামপুরের তালমোহাম্মদের হাটে যায় অপারেশন করার জন্য। কথা ছিলো উভয় গ্রুপ অপারেশন শেষ করে রাঞ্চারাম বামনী বেড়ির ওপর একত্রিত হওয়ার। বাংলাবাজারে অপারেশন শেষ করে আমাদের গ্রুপটি বামনী বেড়ির দিকে রওয়া হয়। কিন্তু আমাদের জন্য অপেক্ষা করে দেরী দেখে এবং পরে আমাদের আসার খবর পেয়ে খিজির হায়াত খানের নেতৃত্বাধীন গ্রুপটি পশ্চিম দিকে অগ্রসর হয়। সেসময় পাকিস্তানী বাহিনীর একটি হেলিকপ্টার বেড়ির ওপর চক্কর দেয়। পরে বসুরহাট থেকে পাকিস্তানী বাহিনী ও রাজাকাররা এসে যে স্থানে খিজির হায়াত খানের গ্রুপ ছিলো সেখানে অবস্থান নেয়। সকাল সাড়ে ১০টার দিকে আব্দুর রাজ্জাকের নেতৃত্বাধীন আমাদের গ্রুপটি বেড়ির ওপর পৌঁছামাত্রই পাকিস্তানী বাহিনী আমাদের ওপর আক্রমন করে। আমরাও পাল্টা জবাব দিতে থাকি। কিন্তু হঠাৎ আক্রমনের কারণে সেখানে আমাদের ৬জন সহযোদ্ধা এবং তিনজন সাধারণ মানুষ মারা যায়। সেদিন শহীদদের মধ্যে ছিলেন চৌমুহনী কলেজের মেধাবী ছাত্র সালেহ আহম্মদ মজুমদার (পরবর্তীতে তাঁরা নামানুসারে চৌমুহনী সালেহ আহম্মদ কলেজ নামকরণ করা হয়), কিশোর আমান উল্যা ফারুক, টগবগে তরুন মোস্তফা কামাল ভুলু, আব্দুর রব বাবু, আকতারুজ্জামান লাতু ও ইসমাইল। গুলিবিদ্ধ হই আমি।
অনুলিখন
রুদ্র মাসুদ