চিকিৎসার অভাবে ঝরছে কত প্রাণ!
12
সুমন ভৌমিক
নাছির উদ্দিন (১২)। অচেতন অবস্থায় বাবার কোলে। বাড়ির পাশে শীম গাছ লাগাতে গিয়ে খন্তায় পা কেটেছে। তাই কোলে নিয়ে প্রায় ১২ কিলোমিটার পথ পায়ে হেঁটে অবশেষে ‘চার খালের মাথা’ ঘাটে ট্রলারের অপেক্ষায়। ৫ কিলোমিটার নদীপথ ছাড়াও আরো প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার বসুরহাটে যেতে হবে ডাক্তার দেখাতে। কিন্তু এ সময় ট্রলার না পাওয়ায় সন্তানকে নিয়ে উদ্বেগ-উৎকন্ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে হয় বাবা বেলাল হোসেনকে।
এ দৃশ্য কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরএলাহি ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডস্থ দ্বীপ উড়ির চরের। সম্প্রতি সরেজমিনে গেলে দৃশ্যটি চোখে পড়ে। তবে পরবর্তীতে ওই ছেলেটির কি পরিণতি হয়েছে তা জানা যায়নি।
স্থানীয়রা জানান, শুধু নাছির উদ্দিন নয়। হাত-পা কাটা, অন্ত:স্বত্বা, হৃদরোগ, হাইপারটেনশনসহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে প্রায় এভাবে ঘাটে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় অনেক রোগিকে। নির্দিষ্ট সময়ে চিকিৎসা নিতে না পেরে প্রতি বছরই নারী, শিশুসহ বহু মানুষ মৃত্যুর মুখে পতিত হচ্ছে। অন্ত:স্বত্বা অবস্থায় সন্তানকে পেটে নিয়ে সন্তানসহ অনেক মা-ই মৃত্যু বরণ করেছে দ্বীপে। হৃদরোগ ও ব্রেন স্ট্রোক করে মারা গেছে অনেকে। যার খবর কেউ রাখেনি, নেয়নি।
৬নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য (মেম্বার) আবুল কাশেম জানান, গত তিন-চার মাস পূর্বে নির্দিষ্ট সময়ে চিকিৎসা দিতে না পারায় মারা গেছে দ্বীপের চরউমেদ গ্রামের আলা উদ্দিনের স্ত্রী ছবুরা খাতুন (২৫)। ডেলেভারি ব্যাথা অনুভব হলেও সন্তান প্রসব না হওয়ায় তাকে হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু জোয়ার না থাকায় অনেক দেরি হয়ে যায়। পরবর্তীতে জোয়ার আসলে নোয়াখালী জেলা শহর মাইজদীতে নিয়ে হাসপাতালে সিজার করিয়ে সন্তানকে বাঁচানো গেলেও ওই মাকে ব্াঁচানো সম্ভব হয়নি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, প্রায় ৩৫ বছর পূর্ব থেকে এ দ্বীপে মানুষের বসবাস। বর্তমানে এখানে সাড়ে ৪ হাজার পরিবারে ৩০ হাজারেরও বেশি মানুষ বসবাস করছে। দ্বীপটি কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার চরএলাহি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড। যা কোনো কোনো ইউনিয়নের চেয়েও অনেক বড়। মেঘনা ও বামনিয়া এই দুই নদীর বুকে জেগে ওঠা দ্বীপটি মূল ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন। এখানে সরকারি বা বেসরকারি হাসপাতালতো দুরের কথা নেয় ক্লিনিকও। ওয়ার্ড ভিত্তিক কমিউনিটি ক্লিনিক থাকার সুযোগ থাকলেও এখানে তা নেই। দু-একটি ফার্মেসি থাকলেও সেখানে কোনো ডাক্তার নেয়। ফলে চিকিৎসার অভাবে ভুগতে হচ্ছে দ্বীপের বাসিন্দাদের। প্রায় কোথাও না কোথাও ব্রেন স্ট্রোক করে, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে ও ডেলেভারি সমস্যায় মৃত্যুর ঘটনা অহরহ ঘটছেই।
সূত্র জানায়, পুরো দ্বীপে একটি মাত্র সড়ক। তাও আবার কিছু কাঁচা, কিছু সলিং। মূল দ্বীপে একমাত্র বাহন ভাড়ায়চালিত মোটর সাইকেল। দ্বীপের অভ্যন্তরে একটি নৌ ঘাট রয়েছে। অপর প্রান্তে চর লেংটা ঘাট। দুই ঘাটের মধ্যখানে নদী পথ পাড়ি দিতে হয় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। নদী পথের জন্য প্রতিদিন মাত্র দুটি ইঞ্জিনচালিত নৌকা থাকে। তাও জোয়ার-ভাটার উপর নির্ভর। এছাড়া ট্রলারে নির্দিষ্ট পরিমাণ যাত্রী না হলে অপেক্ষায় থাকতে হয়। এরপর উপজেলার মূল শহর বসুরহাটে যেতে সিএনজিচালিত অটোরিকশা বা ভাড়ায় চালিত মোটর সাইকেলে আরো ২৫ কিলোমিটার সড়ক পথ পাড়ি দিতে হয়। ইউনিয়নের চরএলাহি বাজারে একটি স্বাস্থ্য কেন্দ্র থাকলেও সেখানে ২৪ ঘন্টা ডাক্তার পাওয়া যায় না। তাই দ্বীপের মানুষকে যেতে হয় বসুরহাট কিংবা ৫০ কিলোমিটার দুরে জেলা শহরে। এতসব প্রতিকূল পরিবেশকে ডিঙিয়ে চিকিৎসা সেবা নেয়া আর হয়ে ওঠে না দ্বীপের বাসিন্দাদের। ফলে অনেককেই চিকিৎসা না নিয়ে ধুকে ধুকে মৃত্যুকে মেনে নিচ্ছে।
চরএলাহী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবদুর রেজ্জাক বলেন, দ্বীপটি কোনো কোনো ইউনিয়ন থেকেও বড়। এটি তার ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ড হলেও মূল ইউনিয়ন থেকে বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ইচ্ছা থাকা স্বত্বেও পর্যাপ্ত সুযোগ সুবিধা দেয়া মুসকিল। তাঁর মতে, দ্বীপটি অবহেলিত। উপজেলা পর্যায়ের বিভিন্ন সভায় দ্বীপের স্বাস্থ্য সেবা তথা চিকিৎসা সেবা নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে একাধিকবার তিনি প্রস্তাব রেখেছেন।
বাসিন্দাদের অভিযোগ, আ.লীগের বর্তমান সাধারণ সম্পাদক তথা সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে থাকা ওবায়দুল কাদেরের নির্বাচনী এলাকা এ দ্বীপ। এখানকার মানুষ ইউপি, উপজেলা ও সংসদ নির্বাচনে ভোটাধিকার প্রয়োগও করেন। কিন্তু তাদের ভাগ্যে মৌলিক অধিকারটুকুও ঝুটে না। কিন্তু এখানকার বাসিন্দারা বছরে হাজার হাজার মন ধান ও সবজি উৎপাদন করছে। আহরণ করছে মাছ ও কাকড়া। এখানকার মাছ জেলার বিভিন্ন বাজারে যাচ্ছে। এমনকি আহরিত কাঁকড়া বিদেশেও রফতানি হচ্ছে। অথচ বাসিন্দারা থাকছে অবহেলায়। মরতে হচ্ছে চিকিৎসা ছাড়া। তাঁরা এ দ্বীপে একটি কমিউনিটি ক্লিনিক নির্মাণ করার দাবী জানান। একই সঙ্গে ক্লিনিকে সার্বক্ষণিক চিকিৎসক, ওষধসহ পর্যাপ্ত চিকিৎসা সরঞ্জামাদী যেন থাকে তাও নিশ্চিত করার দাবী জানান।
জানতে চাইলে দ্বীপে কোনো প্রকার চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকার কথা স্বীকার করলেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. মো. সেলিম। তিনি বলেন, দুর্গম এলাকা হওয়ায় দ্বীপের বাসিন্দারা অনেকটা চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত। তবে দ্বীপের সীমান্তবর্তী সন্দ্বিপ উপজেলার স্বাস্থ্যকর্মী ও মাঝে মধ্যে কোম্পানীগঞ্জের স্বাস্থ্যকর্মীরা সেখানে কিছু সেবা দিচ্ছে। ভবিষ্যতে প্রশাসনিকভাবে আয়োজিত সভা-সেমিনারে এ দ্বীপের স্বাস্থ্য সেবা নিশ্চিতের উদ্দেশ্যে আলোচনা করা হবে এবং সংশ্লিষ্ট উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি অবহিত করা হবে বলেও জানান তিনি।  
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জামিরুল ইসলাম বলেন, উপজেলার দুর্গম বেশকিছু এলাকা পরিদর্শনও করেছেন। উড়ির চরের বাসিন্দারা অবহেলিত; এমন কথা তিনি শুনেছেন। সহসায় দ্বীপটি পরিদর্শন করে এ অঞ্চলের স্বাস্থ্য সেবাসহ মৌলিক অধিকারগুলো নিশ্চিতের লক্ষ্যে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করবেন বলে আশ্বস্ত করেন এ কর্মকর্তা।