হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে : ৪০ দিনে ১৪ শিশু ও নবজাতকের মৃত্যু!
13
বিশেষ প্রতিনিধি হাতিয়া থেকে ফিরে
নোয়াখালীর দ্বীপ উপজেলা হাতিয়ায় সরকারি স্বাস্থ্যসেবা তলানিতে ঠেকেছে। কোন একটি অসুস্থতা বেড়ে গেলেই হু হু করে মৃতের সংখ্যা বাড়তে থাকে। গত ৪০ দিনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নিতে আসা ১৪ শিশু ও নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে বেশিরভাগই মারা গেছে ঠান্ডাজনিত বিভিন্ন রোগে। পরিস্থিতি এমনটাই খারাপ যে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় এক তৃতীয়ংশই শিশু। হাসপাতালে চিকিৎসক সংকট এতোটাই প্রকট যে ৩১জন চিকিৎসকের জায়গায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন ১০জনে।  বিশেষজ্ঞ শিশু চিকিৎসক না থাকায় সাধারণ চিকিৎসকেরাই শিশুদের সব জটিল রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।
মেঘনা আর বঙ্গোপসাগর বেষ্টিত হাতিয়া উপজেলার বেশীর ভাগ গ্রামই দুর্গম চরাঞ্চল। ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এ উপজেলায় প্রায় ৮ লক্ষ লোকের জন্য একমাত্র সরকারি স্বাস্থ্য কেন্দ্র হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। ৫০ শয্য বিশিষ্ট হাতিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে প্রতিদিন দুর্গম চর থেকে শত শত শিশুসহ বিভিন্ন বয়সীরা চিকিৎসা সেবা নিতে এসে ন্যুনতম চিকিৎসা সেবা থেকে বঞ্চিত হয়।
সরজেমিনে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে দেখা যায়, বর্তমানে এ হাসপাতালে শিশু রোগীর সংখ্যা বেশী। পরিস্থিতি এমনটাই খারাপ যে, হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রোগীদের প্রায় এক তৃতীয়ংশই শিশু। সীমিত সংকট বেডে ভর্তি হওয়া শিশুদের চিকিৎসা দিতে হিমশিম খাচ্ছে হাসপাতাল। ফলে বহি বিভাগে চিকিৎসা দিয়ে বেশীর ভাগ শিশু রোগীদের বাড়ী নিয়ে যাচ্ছেন অভিভাবকরা।
হাসপাতালের জরুরী বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ১ অক্টোবর থেকে ১২ নভেম্বর পর্যন্ত ১হাজার ৪’শ রোগী ভর্তি হয় এ হাসপাতালে। এর মধ্যে ৪০০ শিশু, এবং গত এক সপ্তাহে এ হাসপাতালে রোগী ভর্তি হয় ২১৬ জন। তার মধ্যে ১২০ জনই শিশু। ভর্তি হওয়া শিশুদের মধ্যে মারা গেছে এ পর্যন্ত ১৪ জন। বেশীর ভাগ শিশু মারা গেছে নিউমোনিয়া,স্বাস কস্টসহ বিভিন্ন ঠান্ডাজনিত রোগে।
মারা যাওয়া শিশুরা হল: ইভানা (৩), ওবায়েদ উল্লা (৬ মাস), জাহেদা বেগমের নবজাতক (৩ দিন), আল-আমিন (৯ দিন), রিনা আক্তারের নবজাতক (৭ দিন), পান্না বেগমের নবজাতক (১৩ দিন), মোহাম্মদ (১০ দিন), সীমা আক্তারের নবজাতক (৬ দিন), লাভলি আক্তারের নবজাতক (১ দিন), পারভিন আক্তারের নবজাতক (১ দিন), মো. সজিব (৫ মাস), মো. বাবু (১ দিন), মিনারা বেগমের অকাল জন্ম নেওয়া শিশু ও সীমা বেগমের নবজাতক (১২ দিন)।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে শিশু রোগের নির্দিষ্ট কোনো চিকিৎসক নেই। সাধারণ চিকিৎসকেরাই শিশুদের সব জটিল রোগের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন।  বিভিন্ন পদে ৩১ জন চিকিৎসক থাকার কথা থাকলেও বর্তমানে এ হাসপাতালে রয়েছে ১০ জন। তার মধ্যে দুইজন অননুমোদিত ছুটিতে,একজন ছুটিতে,দুই জন প্রশিক্ষনে। ফলে ৫ জন সাধারন চিকিৎসক দিয়ে বর্তমানে এ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে জোড়াতালি দিয়ে চলছে চিকিৎসাসেবা।
জাহাজমারা থেকে আসা আরতি বালা জানান, সাত মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে এসছেন। গত কয়েকদিনের ঠান্ডায় শিশুটির জ¦রের সাথে সাথে কাশি দেখা দিয়েছে। একই সাথে পাতলা পায়খানাও শুরু হয়েছে। তার ওপর আবার শ্বাস কস্ট ।  আরতি বালার মতো উপজেলার দুর দুরান্ত দুর্গম চর থেকে এভাবে শিশু রোগ আক্রান্তদের নিয়ে স্বজনরা ছুটে এসেছেন হাসপাতালে।
দ্বীপবাসীর স্বাস্থ্যসেবার দুরবস্থা নিয়ে কথা হয় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ নাজিম উদ্দিনের সাথে। এখানকার অভিভাবকেরা সচেতন না হওয়ায় বেশিরভাগ শিশুরই অবস্থা যখন খারাপের দিকে চলে যায় বলে তিনি মন্তবব্য করেন। হাসপাতালে আসার আগে বিভিন্ন ঝাঁর ফুক দিয়ে তারা অসুস্থ শিশুগুলোকে সংকটাপন্ন করে তোলেন। শেষ পর্যায়ে  হাসপাতালে আনা হয়।  তখন চিকিৎসা দিয়েও যথাযত ফল পাওয়া যায় না, শিশুর মৃত্যু ঘটে।  এছাড়া নদী পথ হওয়ার কারণে অনেকে সদর হাসপাতালে নিতে সময় নস্ট হয়। এটিও শিশু মৃত্যুর অন্যতম একটি কারন।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে জেলা সিভিল সার্জন ডাঃ  বিধান চন্দ্র সেন গুপ্ত চিকিৎস সংকটের কথা স্বীকার করে বলেন, গত মাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ শীতের আগমনের সাথে সাথে হাতিয়ার শিশুরা ঠান্ডাজনিত রোগে আক্রান্ত হয় বেশ কয়েকজরেনর প্রাণহানী ঘটেছে। এসময় এক প্রকার ভাইরানের সৃষ্টি হয়। যার ফলে শিশুদের নিউমোনিয়াসহ বেশ কিছু রোগের প্রাদুভাব ঘটে। এ রোগগুলো ঔষধে কাজ হয় না। প্রতিরোধই এ রোগের একমাত্র চিকিৎসা। তিনি আরো জানান,  এ হাসপাতালে অতি দ্রুত শিশু বিশষেজ্ঞসহ আরো কয়েকজন মেডিকেল অফিসার দেয়ার জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রনালয়ে চিঠি দিয়েছেন।



কর্মসূচী/অনুষ্ঠান ও প্রবাসের খবর